নিউ টাউনে ২ হাজার বেডের ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’

0

নিউ টাউনে ২ হাজার বেডের ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’

৪ হাজার কোটিরও বেশি বিনিয়োগে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১ হাজার শয্যা আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য; থাকছে মেডিক্যাল কলেজ, ক্যানসার চিকিৎসা ও অত্যাধুনিক গবেষণার পরিকাঠামো

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা, ২৪ সেপ্টেম্বর:
কলকাতার চিকিৎসা-মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহুদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু হল নিউ টাউনে প্রস্তাবিত ২,০০০ শয্যার ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এর। বৃহস্পতিবার বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি টেক হাব এলাকায় প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

আদানি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তৈরি হতে চলা এই প্রকল্পে ৪,০০০ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ৫১.৭৫ একর জমির উপর গড়ে উঠবে হাসপাতালটি। শুধু হাসপাতাল নয়, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘অ্যাকাডেমিক মেডিক্যাল সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থার দাবি, ভবিষ্যতে বছরে ২ লক্ষেরও বেশি ইনডোর রোগী এবং ২০ লক্ষের বেশি আউটডোর রোগী পরিষেবা পেতে পারেন। প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

অর্ধেক বেড আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য

প্রকল্পটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল ২,০০০ শয্যার মধ্যে ১,০০০টি বেড অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির রোগীদের জন্য রাখার ঘোষণা। আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি জানিয়েছেন, রাজ্য ও কেন্দ্রের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের আওতায় যোগ্য রোগীরা এই সুবিধা পাবেন। হাসপাতালটিকে লাভের উদ্দেশ্যে নয়, ‘নট-ফর-প্রফিট’ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

প্রথম ধাপে বিশেষ নজর ক্যানসার চিকিৎসায়

প্রথম পর্যায়ে মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতালটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে ক্যানসার চিকিৎসা। উন্নত তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা এবং বিভিন্ন সুপার-স্পেশালিটি পরিষেবা দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি করা হবে।

শুধু চিকিৎসা পরিষেবা নয়, প্রকল্পে থাকবে স্টেপ-ডাউন ও ট্রানজিশনাল কেয়ার-এর ব্যবস্থাও। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের পরিবারের সদস্যদের থাকার জন্য Meditel এবং Vishram Gruh তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাও বৃহত্তর ক্যাম্পাস পরিকল্পনার অংশ।

হাসপাতালের সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজ

‘আদানি আরোগ্য মন্দির’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে মেডিক্যাল শিক্ষা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে একটি মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হবে। সেখানে প্রতি বছর ১৫০ জন স্নাতক, ১০০-র বেশি পোস্টগ্র্যাজুয়েট এবং ৪০-র বেশি সুপার-স্পেশালিস্ট চিকিৎসকের প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকবে।

এর পাশাপাশি তৈরি হবে নার্সিং কলেজ এবং অ্যালায়েড হেলথকেয়ার ও প্যারামেডিক্যাল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ফলে একই ক্যাম্পাসে চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের একটি সমন্বিত পরিকাঠামো গড়ে উঠবে।

AI থেকে জিনোমিক্স—গবেষণাতেও জোর

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনায় রয়েছে জিনোমিক্স, প্রিসিশন মেডিসিন, বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং মলিকিউলার ও অ্যাপ্লায়েড বায়োমেডিক্যাল সায়েন্স নিয়ে গবেষণার পরিকাঠামো।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল কেয়ার, মেডিক্যাল শিক্ষা, ডিজিটাল হেলথ, স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্যে আমেরিকার Mayo Clinic Global Consulting এবং সিঙ্গাপুরের SingHealth-এর সঙ্গে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে আদানি ফাউন্ডেশন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘Centre of Excellence’

প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রোগ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে Centre of Excellence গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে পূর্ব ভারতের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য রাজ্য বা দেশের বিভিন্ন শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বাংলায় আরও বড় বিনিয়োগের বার্তা

এই হাসপাতাল প্রকল্পের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথাও ঘোষণা করেছেন গৌতম আদানি। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে রাজ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দর, লজিস্টিক্স, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন, রাস্তা-সেতু, গ্রিন সিমেন্ট এবং হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের মতো একাধিক ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

একইসঙ্গে ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পুনরুদ্ধার এবং কলকাতার কুমারটুলি ঘাটের উন্নয়ন নিয়েও উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নিউ টাউনের এই প্রকল্প শুধু ২,০০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নয়—চিকিৎসা, মেডিক্যাল শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণকে একই ছাতার নিচে আনার একটি বড় পরিকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবেই এটিকে তুলে ধরেছে আদানি ফাউন্ডেশন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কলকাতার পাশাপাশি পূর্ব ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও চিকিৎসা-শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here