নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: শারদোৎসবের প্রাক্কালে সঙ্গীত, আবৃত্তি, নৃত্য এবং সাহিত্য চর্চার মেলবন্ধনে মুখরিত হয়ে উঠল ‘টপসিয়া আগমনী রেকঁতর অ্যান্ড আর্ট সোসাইটি’র মঞ্চ। নতুন প্রজন্মের সুপ্ত প্রতিভাকে মর্যাদা দিতে এবং বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মহাসমারোহে উদযাপিত হলো তাদের বার্ষিক শারদ যাপন অনুষ্ঠান ‘আগমনীর শারদোৎসব’। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে এই সংগঠনটি নিঃস্বার্থভাবে তরুণ শিল্পীদের প্রতিভা অন্বেষণে নিরলস কাজ করে চলেছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মব্যস্ত জীবনে যেখানে যুবসমাজ অনেক সময় শিকড় থেকে দূরে সরে যায়, সেখানে নতুন প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে পরিচালিত এই আয়োজন উপস্থিত সুধীজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রতি বছরের মতো চলতি বছরেও এই অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি অভিনব চিন্তাভাবনা। ২০২৬ সালের মঞ্চের মূল ভাবনা ছিল ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ অর্থাৎ অন্ধকারের বুক চিরে আলোর অভিমুখে উত্তরণ। উল্লেখ্য, সংগঠনটি ২০২৪ সালে বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের ধারা অবলম্বনে ‘অভয়া মঙ্গল’ এবং ২০২৫ সালে উৎসবের দিনেও ঘরে ফিরতে না পারা পরিযায়ী মানুষদের বাস্তবতাকে থিম হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে এ বছরের সাংস্কৃতিক নিবেদনে যুক্ত হয় এক ব্যতিক্রমী নান্দনিক নিরীক্ষা। প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টির দুই নারী চরিত্র—‘পথের পাঁচালী’র দুর্গা এবং ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের দেবীকে মুখোমুখি এক মঞ্চে দাঁড় করিয়ে একটি চমৎকার নাট্য রূপায়ন ফুটিয়ে তোলা হয়, যা দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানান, লুকায়িত মেধা তুলে ধরতে জেলা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার এমনকি বিদেশ থেকেও প্রতিযোগীরা মেধা অন্বেষণে অংশ নিয়েছিলেন। প্রাথমিক বাছাই পর্বে নাম নথিভুক্ত করা প্রায় ৩৫০ জন প্রতিযোগীর মধ্য থেকে বিচারকমণ্ডলী দীর্ঘ মূল্যায়নের পর সেরা ৮০ জন প্রতিভাকে মূল মঞ্চে পরিবেশনার সুযোগ দেন। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের পাশাপাশি এদিন প্রকাশিত হয় আগমনীর ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকা ‘আগমনী শারদ স্মারক’-এর ১১তম সংকলন। দীর্ঘ দুই মাসের কঠোর সম্পাদনার মাধ্যমে নির্বাচিত ৮৫ জন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এবং কয়েকজন বিশিষ্ট কলমচির সৃজনশীল লেখায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে এই স্মরণীয় স্মারকটি।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন নেতাজি গবেষক ড. জয়ন্ত চৌধুরী, বিশিষ্ট গবেষক ড. সুরজিৎকুমার দাস, সঙ্গীতশিল্পী সুজানা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী শুভেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রখ্যাত অঙ্কনশিল্পী রোমান। উপস্থিত অতিথিবৃন্দ আগমনীর এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। উদ্যোক্তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, আজকের কর্পোরেট সংস্কৃতির যুগে ল্যাপটপের দীর্ঘ সময় কাটানো জীবনে মানুষের ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃজনশীল ক্ষমতা যেন হারিয়ে না যায়, বরং তা যেন আত্মবিকাশ ও জীবিকার দিশা দেখাতে পারে—সেই লক্ষ্যেই তাদের এই পথচলা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।
