বন্দে মাতরম মঞ্চের শতবর্ষ ও কবি সুকান্ত স্মরণ শিলিগুড়িতে জেনারেশন অ্যাচিভার-এর বিশেষ মহতী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

0

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ির এইচএমএ সেন্টারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক ঐতিহাসিক ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। সর্বভারতীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জেনারেশন অ্যাচিভার’ (Generation Achiever)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল ভাবধারা ছিল— ‘বন্দে মাতরম’ মঞ্চ শতবর্ষের আলোকে সুকান্ত। ‘বন্দে মাতরম’ মঞ্চের গৌরবোজ্জ্বল ১০০ বছরের পথচলা এবং কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অগ্নিঝরা কালজয়ী কাব্যচেতনাকে এক সুতোয় গেঁথে এই আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। এটি কেবল একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছিল।

সমবেত কণ্ঠে জাতীয় মর্যাদাসম্পন্ন “বন্দে মাতরম” সঙ্গীত উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা ঘটে। এরপর নান্দনিক সূচনা পর্বে স্বাগত ভাষণ দেন জেনারেশন অ্যাচিভার-এর চেয়ারপারসন তথা বিশিষ্ট দূরদর্শী সংগঠক মানব মুখার্জি। তিনি তাঁর বক্তব্যে সংগঠনের ভবিষ্যৎ দিগন্তের কথা তুলে ধরে জানান, আগামী দিনে জেনারেশন অ্যাচিভার দিল্লি সহ সমগ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে বেশ কিছু বিস্তৃত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে দেশের রাজধানী দিল্লিতে একটি সুচিন্তিত ও মননশীল বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একঝাঁক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়, জেনারেশন অ্যাচিভার উত্তরবঙ্গের সভাপতি দীপ্তি মুখার্জী, পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, অলোক চক্রবর্তী, অপূর্ব কুমার গাঙ্গুলী, কাকলি পাল, দেবরাজ পাল, রাজদীপ মুখার্জী, কৃষ্ণেন্দু দাস, কুন্তল গুহ, এবং নির্মলেন্দু দাস প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী সুপ্রিয়া ঘোষ।

এই স্মরণীয় মঞ্চেই সাহিত্য চর্চার এক অনন্য অধ্যায় উন্মোচিত হয়। স্বনামধন্য সাহিত্য প্রকাশনা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার’-এর পক্ষ থেকে প্রকাশিত এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য দিশারীর প্রাণপুরুষ হিমেন্দু দাস রচিত নতুন ছড়ার বই ‘ছন্দে ছন্দে ছড়ার আনন্দে’-র শুভ উন্মোচন ঘটে। উপস্থিত সমস্ত সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ যৌথভাবে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটান। সুকান্ত স্মরণের এই মঞ্চে নতুন একটি ছড়ার বই প্রকাশিত হওয়ায় পুরো আয়োজনে এক নতুন সাহিত্যিক মাত্রা যুক্ত হয়।

অনুষ্ঠানের মূখ্য বার্তা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, শতবর্ষ পেরিয়েও কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও আমাদের মাঝে অমলিন তাঁর কলমের আগুনের জন্য। মাত্র ২১ বছরের ক্ষণজন্মা জীবনে তিনি যে বিদ্রোহ, ক্ষুধা, সামাজিক অসাম্য ও মানবতার বার্তা দিয়ে গেছেন, তা বর্তমান সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক। ‘ছাড়পত্র’ কিংবা ‘ঘুম নেই’-এর মতো তাঁর অমর সৃষ্টি আজও তরুণ প্রজন্মকে নতুন স্বপ্নের দিশা দেখায় এবং অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা জোগায়। এই আলোর মশালই ছিল সমগ্র আয়োজনের মূল চালিকাশক্তি।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই মহাআয়োজনকে নিজ নিজ পরিবেশনায় প্রাণবন্ত করে তোলেন একঝাঁক উদীয়মান ও গুণী শিল্পী। কবিতা আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও যন্ত্রসঙ্গীতের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রেক্ষাগৃহ। পরিবেশনায় অংশ নেন বাণী সিংহ রায়, প্রণতি সাহা, সুমিতা পয়ড়্যা, অনিল চন্দ্র সিকদার, পাপড়ি দত্ত, মিতা সান্যাল কর, শুনন্দা ভাদুড়ী, কৃষ্ণা দাস, হিমেন্দু দাস, পল্লবী পাল, ডলি দেব, গোপা দাস, অর্চনা মিত্র, অরবিন্দ ঘোষ, উজ্জ্বল কুমার পতি, রঞ্জনা গুহ ভট্টাচার্য, নিমাই হালদার, তাপস দেবনাথ, বলরাম সরকার, শাহানাজ বানু, কৃষ্ণেন্দু সেন, ভারতী পাল, রিয়া পাল, শুভেন্দু দাস, বিভাকর দাশগুপ্ত, নারায়ণ সরকার, মলয় সরকার, সুজন দে, প্রবীর রায়, নেপাল বিশ্বাস, চন্দ্রা ঘোষ, মিঠু ঘোষ, মিনতি দেব, রঞ্জিত সাহা, রাজশ্রী মৈত্র, রামকৃষ্ণ পাল, রিঙ্কু ঘোষ, রীনা দত্ত, শম্পা পাল, শ্রাবণী মিত্র মণ্ডল, সুদীপ সাহা, স্বপ্না ব্যানার্জী, সুব্রত দত্ত, সম্পা দত্ত, পাপিয়া বণিক, সোমা ভট্টাচার্য, সৌমেন সেন, সুব্রত চ্যাটার্জী, বকুল সাহা চৌধুরী, কাকলি পাল, স্বপন দাস, শ্রাবণী ব্যানার্জী, মিত্রজিৎ সান্যাল প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বাংলা সংস্কৃতি ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ গুণীজন ও অতিথিবৃন্দের হাতে “বন্দে মাতরম সম্মাননা” প্রদান করা হয়। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে তুলে দেওয়া হয় “আনন্দমঠ সম্মাননা” এবং “ঋষি বঙ্কিম সম্মাননা”। আবেগ, উদ্দীপনা এবং জাতীয় সঙ্গীতের গাম্ভীর্যপূর্ণ সুরের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের বুকে এই অবিস্মরণীয় সাংস্কৃতিক যজ্ঞের সার্থক সমাপ্তি ঘটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here