সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের টানাপোড়েন ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম আবেগকে সেলুলয়েডে তুলে ধরে কলকাতার চলচ্চিত্র চর্চার প্রাণকেন্দ্র নন্দন ৩-এর প্রেক্ষাগৃহে বিপুল সাফল্য পেল বাস্তববাদী স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘চিতল পেটি’। ‘বং সিনেমাটিক’-এর নিবেদনে তৈরি এই ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনী শেষে পুরো প্রেক্ষাগৃহ মুখরিত হয়ে ওঠে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও দর্শককূলের দীর্ঘ ও উচ্ছ্বসিত করতালিতে।
ছবিটির মূল ভাবনা ও কাহিনি রচনা করেছেন মধুমিতা দেব এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবিটি পরিচালনা করেছেন বিস্বরূপ সিনহা। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই, অসুস্থ বাবার চিকিৎসার তীব্র দায়ভার এবং শত অভাবের মাঝেও মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মসম্মানবোধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছবিটির আখ্যানভাগ। মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট অপূর্ণ ইচ্ছা—যেমন পাতে এক টুকরো ‘চিতলের পেটি’ খাওয়ার মতো অত্যন্ত সাধারণ আকাঙ্ক্ষাও কীভাবে বাস্তবতার কষাঘাতে আড়ালে চলে যায়, তা পরিচালক অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মতভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন।
এই ছবির অন্যতম বড় প্রাপ্তি ও কেন্দ্রবিন্দু সাংবাদিক এবং অভিনেতা রিজু রায়ের বলিষ্ঠ ও পরিমিত অভিনয়। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সমাজ ও বাস্তব জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার যে গভীর অভিজ্ঞতা, তা রিজু রায় অত্যন্ত সাবলীল দক্ষতায় তাঁর চরিত্রের মধ্যে প্রতিফলিত করেছেন। ক্যামেরার সামনে তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ, চোখের ভাষা এবং তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বের মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলার ধরন উপস্থিত দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে অভাবের মাঝে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাওয়ার দৃশ্যটিতে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল এককথায় অনবদ্য ও প্রশংসনীয়।
রিজু রায়ের পাশাপাশি ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবমুখী চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন অজয় ভট্টাচার্য এবং সনৎ-সহ অন্যান্য কলাকুশলীরা। প্রতিটি চরিত্রের পরিমিতিবোধ ও সম্মিলিত অভিনয়শৈলী ছবিটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তথাকথিত চটকদার বিনোদনের ভিড়ে মাটির কাছাকাছি থাকা এক সৎ ও হৃদয়স্পর্শী গল্প দর্শকদের উপহার দিয়ে ‘চিতল পেটি’ নন্দনের মঞ্চে নিজের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেল।
