রাত তখন প্রায় বারোটা। কলকাতার এক পুরোনো স্টেশন—নিস্তব্ধ, কেবল বাতাসে ভেসে আসছে ভাঙা সিগন্যালের কর্কশ শব্দ। অরিন্দম অফিসের কাজ শেষে দেরি করে ফিরছিল। শেষ ট্রেনটা ধরার জন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই সে বুঝতে পারল, আজ কিছু যেন অস্বাভাবিক।
স্টেশনে আর কেউ নেই। হঠাৎ দূরে অন্ধকারের ভেতর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল। ট্রেনটা থামতেই অরিন্দম উঠে পড়ল। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই তার বুক কেঁপে উঠল—পুরো কামরাটা ফাঁকা, শুধু এক কোণে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা বসে আছেন, মাথা নিচু করে।
ট্রেন চলতে শুরু করল। অরিন্দম আস্তে করে পাশের সিটে বসল। হঠাৎ খেয়াল করল, মহিলার পা মাটিতে নেই—শূন্যে ভাসছে। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথায় নামবেন?”
মহিলা ধীরে মাথা তুললেন। তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো, কোনো সাদা অংশ নেই। ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমি তো কখনো নামিনি… এই ট্রেনেই রয়ে গেছি।”
হঠাৎ ট্রেনের আলো নিভে গেল। চারপাশ অন্ধকার। অরিন্দম চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ঠান্ডা একটা হাত তার কাঁধে পড়ল।
আলো ফিরতেই সে দেখল—সে একা। কোনো মহিলা নেই। কিন্তু তার পাশে সিটে একটা পুরোনো টিকিট পড়ে আছে, তারিখ—১৫ বছর আগে।
পরদিন খবরের কাগজে সে পড়ল—এই একই ট্রেনে বহু বছর আগে এক মহিলা আত্মহত্যা করেছিলেন, তারপর থেকেই মাঝে মাঝে সেই কামরায় তার দেখা মেলে।
অরিন্দম আর কখনো রাতের শেষ ট্রেন ধরেনি।
কিন্তু মাঝে মাঝে, গভীর রাতে, তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল আসে…
ওপারে শুধু একটাই কথা শোনা যায়—
“আমি এখনও ট্রেনে আছি…”
