*”ইসলাম ও মানব ভ্রাতৃত্ব”*
–জুবায়ের আহসান
আমরা বিশ্ববাসী মানুষ সকলেই একই স্রষ্টা বিধাতার সৃষ্ট ও দাস।মানুষের পরস্পরের মধ্যের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন,”ইয়া আইয়ুহান্নাসুত তাকু রব্বাকুমুল্লাজি খলাকা-কুম মিন নাফসিঁউ ওয়াহিদা” অর্থাৎ হে মানবমন্ডলী,তোমাদের প্রতিপালক প্রভুকে ভয় কর,যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন।(সূরা নিসা,আয়াত-১)।সেই হিসাবে সকলের একটি মাত্র মৌল আদর্শ বা ধর্ম হচ্ছে বিধাতার বিধানের নিঃশর্ত আনুগত্য।এই হিসাবে মানবতার ধর্মের বা আদর্শের দিক থেকে হিন্দু-মুসলিম,বৌদ্ধ-খৃষ্টান,ভারতীয়-পাকিস্তানী,আরবীয়-অনারবীয় প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্ম ভাই।আবার আমরা সকলেই একই আদি পিতা-মাতা আদম ও হাওয়ার সন্তান হওয়ায় মানুষ হিসাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের বংশীয় ভাই।পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,”ইয়া আইয়ুহান্নাসু ইন্না খলাক নাকুম মিন জাকারিঁউ ওয়া উনসা” অর্থাৎ হে মানবমণ্ডলী,আমি তোমাদেরকে একটি নর ও একটি নারী থেকে সৃষ্টি করেছি।(সূরা হুজুরাত,আয়াত-১৩)।
মানবতাকে বাঁচতে হলে বা মানব ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আজ জগৎ ধ্বংসকারী বিচ্ছিন্নতাবাদী ভৌগলিক জাতীয়তাবাদের চিন্তাধারার পরিবর্তে এই ঐক্যবাদী অখন্ড বিশ্ব-মানবীয় ভ্রাতৃত্বের আদর্শিক চিন্তার বিপ্লব চাই।
বিধাতার বিধানের আনুগত্যই মানুষকে তার জীবনের সমস্ত বিভিন্নতার মধ্যে একটি ঐক্যসূত্র দান করতে পারে।অন্য কিছু তা পারে না।দেশ বলুন,জাতি বলুন,বর্ণ ও ভাষা যাই বলুন—সবই ভিন্ন ভিন্ন।বিধাতাই মাত্র অভিন্ন এক;সুতরাং বিধাতার বিধানের আনুগত্যই মাত্র মানবতার সমস্ত বিভিন্নতাকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষা করে এক অভিন্ন ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করতে পারে।এরই নাম বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য,এরই নাম মানব ভ্রাতৃত্ব।
বিশ্ব-মানবের আসল ধর্ম বা আদর্শ হচ্ছে এক।ধর্ম বা আদর্শ ছাড়া দেশ,জাতি,বর্ণ,গোষ্ঠী সব বিভিন্ন ও বহু।সুতরাং এই সমস্ত কৃত্রিম জিনিসের উপর ভিত্তি করে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করলে বিভেদ অনিবার্য।কিন্তু ধর্ম বা আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মানব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সূচিত হতে পারে।কেননা বিশ্ব-মানবের সেই কাঙ্খিত মানব ভ্রাতৃত্ব পেতে গেলে বিশ্ব-মানবের জন্য বিধাতার বিশুদ্ধ অবতারিত বিধানের(আল-কুরআনের) ভিত্তিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা রূপায়িত হলেই তবে বিশ্ব-মানবের মধ্যে যথার্থ ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।
সুতরাং মানুষকে বিশুদ্ধ জীবন ব্যবস্থার(ইসলামের) দিকে ফিরতে হবে;অন্য কথায় স্রষ্টার সেই সার্বজনীন মানবিক বিধানের সর্বাত্মক আনুগত্যের দিকে ফিরতে হবে—যে অবতারিত বিধান দুনিয়ার সব মানুষের জন্য এক ও অভিন্ন।যে বিধান মানুষে মানুষে কোন বিভেদ সৃষ্টি করে না,না দেশের বিভেদ,না বর্ণ ও বংশের বিভেদ,যা দুনিয়ার সব মানুষের শাশ্বত জীবন বিধান।যা সব মানুষের সম অধিকার দান করে;যেখানে কোন মানুষই শূদ্র নয়,প্রত্যেকটি মানুষই ব্রাহ্মণ বা পূজ্য।স্রষ্টা ব্রম্ভার অনুগত ও ব্রম্ভের আনুগত্যজনিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।ইসলাম বলে যে প্রত্যেক মানুষের আত্মাই সেই পরম ব্রম্ভ স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার ফুৎকার-জাত হিসাবে সম-মর্যাদার অধিকারী।কেউ আল্লাহর পা থেকে আর কেউ মস্তিষ্ক থেকে—জাত বা সৃষ্টি হয়নি,সকলের আত্মাই আল্লাহর ফুৎকার-জাত এবং সকলের দেহই মৃত্তিকা ও জল-জাত।সব মানুষ সমান,মানুষের মধ্যে কোন উচ্চ-নীচ বর্ণ ভেদ নেই;—যেমন পরম ব্রম্ভ স্রষ্টা আল্লাহ তাঁর শেষ বেদ-বাক্য অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন,”সমগ্র মানুষ এক জাতি ছিল।”
ইসলামের সর্বশেষ Prophet হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) ঘোষণা করেছেন,”হে মানবমন্ডলী সাবধান হও,তোমাদের সকলের প্রভু এক,কোন আরবীয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোন অনারবীয়ের এবং কোন অনারবীয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোন আরবীয়ের।কোন গৌরবর্ণের কৃষ্ণবর্ণের উপর এবং কোন কৃষ্ণবর্ণের গৌরবর্ণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই।শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি ভক্তি ভয় ও তাঁর প্রতি কর্তব্য পরায়ণতা।”তিনি আরো বলেছেন,”যে কেউ অন্ধভাবে নিজ সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর পক্ষ সমর্থন করে,সে আমার দলভুক্ত নয়।”এবং পবিত্র কুরআনের অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে,”কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের বিচার-চ্যুত না করে,ইনসাফ কর,ইহা ধার্মিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।”
পবিত্র কুরআন-হাদীসের বর্ণিত উদ্ধৃতিসমূহে সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে যে মানবিকতা প্রতিফলিত হয়েছে,তা হচ্ছে শাশ্বত ধর্ম বা আদর্শের দৃষ্টিতে মানবিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের নিদর্শন।এই নিদর্শনের আলোকে যদি বিশ্ব-ব্যবস্থা পরিচালিত হয় তাহলে মানবীয় ঐক্য,ভ্রাতৃত্ব ও সংহতির রূপ পরিলক্ষিত হবে।
——————
নিমদীঘি, উলুবেড়িয়া, হাওড়া।
মোবাইল-৯০৩৮৬৭০৬৬৪
