একদল তরুণের হাত ধরে রেজিনগরে ইতিহাস: মহাসমারোহে সম্পন্ন হলো রেজিনগর সাহিত্য উৎসব

0

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক আত্মার মতোই নিবিড়। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবনের রক্ত ঢেলে দেওয়া এই জাতি চিরকালই সাহিত্যকে অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধারণ করেছে। সেই চিরন্তন সাহিত্যপ্রেমকে হৃদয়ে ধারণ করে রেজিনগরের বুকে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “রেজিনগর সাহিত্য উৎসব—২০২৬”। রেজিনগর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাহিত্য পরিষদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই উৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পরিচালন কমিটির অধিকাংশ সদস্যেরই তরুণ বয়স। মোহাদ্দেস সেখ, ফারুক আহাম্মেদ, সাবির আহমেদ, আব্দুল সামাদ ও সেলিম সেখ-সহ তরুণ উদ্যোক্তাদের এই সুসংগঠিত ও মননশীল উদ্যোগকে এলাকার সুধীসমাজ, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ এবং শিক্ষাবিদেরা আন্তরিক সাধুবাদ জানিয়েছেন।গত ২ আগস্ট ২০২৬, রবিবার, রেজিনগরের ঐতিহ্যবাহী রামপাড়া মাঙ্গনপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় এই সাহিত্য উৎসব। আনুষ্ঠানিকভাবে ফিতে কাটা এবং পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিয়ে বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট গবেষক তথা শ্রীপত সিং কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. দেবযানী ভৌমিক (চক্রবর্তী)। উদ্বোধনী পর্বে তাঁর সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব, গভীর ধৈর্য এবং আন্তরিক ব্যবহারে উপস্থিত সুধীজন ও অতিথিবৃন্দ অত্যন্ত মুগ্ধ হন।অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক গোপা মুখার্জী এবং রেজিনগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওসি) তপায় বিশ্বাস-সহ অন্যান্য গুণীজনেরা। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুই শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও লেখিকা এই আনন্দযজ্ঞে শামিল হওয়ায় রেজিনগর রামপাড়া এলাকাটি সাহিত্যপ্রেমীদের এক প্রাণবন্ত মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।উৎসবের সারাদিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সাহিত্য পত্রিকা “শব্দের বিপ্লব”-এর উন্মোচন। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি দিনভর চলে মনোজ্ঞ কবিতা পাঠ, স্বরচিত সাহিত্য পাঠ, সংগীত পরিবেশনা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উৎসবে অংশগ্রহণকারী কবি ও সাহিত্যিকদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের হাতে “নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্মারক সম্মাননা—২০২৬” তুলে দেওয়া হয়।একই সাথে সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয় “মীর মদন গৌরব সম্মাননা—২০২৬”। উক্ত সম্মাননায় ভূষিত হন— শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. দেবযানী ভৌমিক (চক্রবর্তী) এবং সেলিম সেখ (শিক্ষা ও গবেষণা), ডা. মোঃ আরিফ বিল্লাহ ও ডা. সামিন আক্তার (চিকিৎসাসেবা), গোপা মুখার্জী (ইতিহাস ও ঐতিহ্য), লিটল ম্যাগাজিন ‘উত্তরের সিঁড়ি’ (সেরা সাহিত্য পত্রিকা), ওসমান গনি খান (সমাজসেবা) এবং আজিবর মণ্ডল ‘কবিতা ওয়ালা’ (সাহিত্য)। এছাড়া অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলায় অনুপ্রেরণা দিতে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় “জ্ঞানদ্বীপ সম্মান—২০২৬”।দিনভর সাহিত্য, সংস্কৃতি, সম্মাননা ও সৌহার্দ্যের চমৎকার আবহে রেজিনগর যেন এক চাঁদের হাটে রূপ নিয়েছিল। এই সফল আয়োজনের মাধ্যমে রেজিনগর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাহিত্য পরিষদ প্রমাণ করল যে বর্তমান প্রযুক্তি সংস্কৃতির যুগেও নবীন প্রজন্ম সাহিত্যচর্চা ও ঐতিহ্যের প্রতি সমানভাবে দায়বদ্ধ। তরুণদের এমন সুবিন্যস্ত ও দূরদর্শী আয়োজন উপস্থিত সকলকে যেমন বিস্মিত করেছে, তেমনই আশান্বিতও করেছে। বিশিষ্টজনদের মতে, রেজিনগরের এই সাহিত্য উৎসব কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সমাবেশ ছিল না, বরং এটি ছিল তরুণদের হাত ধরে নতুন এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সূচনা, যা ভবিষ্যতের সাহিত্য অঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী প্রেরণা জোগাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here