অবনীন্দ্র সভাগৃহে আয়োজিত হলো শিখা রানী দাস গণেশ দাস কালচারাল একাডেমীর বিশেষ উৎসব

0

কলকাতার সাংস্কৃতিক আঙিনায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে অবনীন্দ্র সভাগৃহে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘শিখা রানী দাস গণেশ দাস কালচারাল একাডেমী’-র এক বর্ণাঢ্য সাহিত্য ও সমাজসেবামূলক উৎসব। “জেগে থাকে জাগিয়ে রাখে”— এই কালজয়ী স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি ছিল একাধারে সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। মূলত বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্র করেই এই অনুষ্ঠানের সোপান রচিত হয়।

কলকাতায় সাহিত্য ও সমাজসেবার অনন্য মেলবন্ধন: অবনীন্দ্র সভাগৃহে আয়োজিত হলো শিখা রানী দাস গণেশ দাস কালচারাল একাডেমীর বিশেষ উৎসব

একাডেমীর কর্ণধার সঙ্গীতা দাস তাঁর প্রয়াত পিতা-মাতার স্মৃতি রক্ষা এবং তাঁদের আদর্শকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যেই এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন। তাঁর এই মহতী উদ্যোগের প্রধান ব্রত হলো সেইসব প্রতিভাবান মানুষদের একটি সঠিক মঞ্চ প্রদান করা, যাঁরা সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছেন। সঙ্গীতা দাসের মতে, প্রতিভা কখনো অর্থের কাছে হার মানতে পারে না; আর সেই হার না মানা জেদ থেকেই তিনি এমন এক মঞ্চ তৈরি করেছেন যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। এই একাডেমীর আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে মানুষের মনে ‘হিলিং’ বা ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার করা, যা বর্তমানের কর্মব্যস্ত জীবনে মানসিক প্রশান্তির এক বিশেষ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

অনুষ্ঠানের সমাজসেবামূলক পর্যায়টি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। শুধুমাত্র মঞ্চে শিল্পচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে একাডেমীটি সরাসরি আর্তের সেবায় এগিয়ে এসেছে। এদিন দুস্থ ও অসহায় ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার পথ মসৃণ করতে তাদের হাতে খাতা, পেনসিল, পুস্তকসহ বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী এবং নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষার প্রসারে এমন সরাসরি অংশগ্রহণ উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। একাডেমীর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সংস্কৃতি চর্চা মানেই হলো মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

এই মহতী আসরে উপস্থিত ছিলেন এক ঝাঁক নক্ষত্র ব্যক্তিত্ব। বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক সুনীল চক্রবর্তী, প্রখ্যাত সমাজসেবক শ্যামল বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখিকা ডক্টর এস জাসমিন সহ সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের দিকপালরা এই আয়োজনকে অলঙ্কৃত করেন। অনুষ্ঠানের মূল সঞ্চালক সুনীল চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে সঙ্গীতা দাসের এই লড়াই ও উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য পরিষদ এবং রামমোহন বিদ্যাসাগর একাডেমির পক্ষ থেকে এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে সর্বদাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী ওতি সাহা সংস্কৃতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, গান-বাজনা ও শৈল্পিক চর্চাহীন সমাজ ক্রমেই অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়, তাই এমন প্রদীপশিখা প্রজ্বলিত রাখা একান্ত প্রয়োজন।

পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল সাহিত্য পাঠ, আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার এক জমজমাট কোলাজ। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি ও শিল্পীদের কণ্ঠে বাংলা ভাষার জয়গান ধ্বনিত হয়েছে। সাহিত্য জগতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব এবং প্রাক্তন রেলকর্মী ও এফএম উপস্থাপকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। পরিশেষে বলা যায়, অবনীন্দ্র সভাগৃহের এই আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং তা ছিল সুন্দর আগামীর এক ইতিবাচক বার্তা। সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং নিঃস্বার্থ সমাজসেবাকে পাথেয় করে এই একাডেমী আগামী দিনে আরও বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে যাবে, এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here