শেষ পরিচয়
জেরিন জাহান দিশা
“মরে গেলে মানুষকে কি তার নামে ডাকা হয়,নাকি শুধু লাশ বলা হয়?”প্রশ্নটা হঠাৎ করেই মাথায় এলো রনির।
সে কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা নতুন
কবর। মাটিটা এখনো ভেজা। লোকজন একটু আগে চলে গেছে। জানাজা শেষ, কান্না শেষ সব শেষ।সে
ভাবছে একজন মানুষ, যে কিছুক্ষণ আগেও “হাজী সাহেব” ছিল, সবাই তাকে সম্মান করত।এখন শুধু একটা কবর।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সবাই জানে হাজী সাহেব কেমন লোক ছিলেন।তার পোশাক- আশাক, দাঁড়ি টুপি দেখে সবাই সালাম করত।তার ধন-সম্পদ দেখে তাকে ভয় পেত।আসলে কেউ মন থেকে সম্মান করত না।তিনি গরিবদের ওপর জুলুম করে অন্যের জমি দখল করে নিত।সমাজে তার প্রভাব ছিল, কিন্তু সম্মানটা ছিল মুখে -মনে নয়।
রনি হঠাৎ নিজের দিকে তাকালো।সে কি খুব আলাদা?সে নিজেও তো অনেক সময় মানুষকে ছোট করে, নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করে।মনে মনে ভাবে-” আমি তো ওদের মতো না।” আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছে
তার ইবাদাত করার জন্য।অথচ মানুষ ভুলে যায়, অন্যায়ের পথে হাঁটে।রনিও কি সে ভুলের বাইরে?
সে বাড়ি ফেরার আগে আবার কবরটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষটার এখন কোন নাম নেই, কোন পদ নেই, কোনো জাত নেই। এখন সে শুধু একজন মৃত মানুষ। হঠাৎ পাশ থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল -একজন বৃদ্ধ,কবরের পাশে বসে মাটি ছুঁয়ে বললেন,”বাবা,মানুষ আসলে দুনিয়ায় একাই আসে, আবার একাই যায়।”রনি চুপচাপ বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলো।
বৃদ্ধ আবার বললেন, “এখানে কেউ বড় না, কেউ ছোট না। এখানে সবাই এক।”কথাগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু রনির মনে যেন ঝড় তুললো।সে ভাবতে লাগলো সে যখন জন্মেছিল, তখন কি তার কোনো পরিচয় ছিল? না।সে শুধু একটা শিশু ছিল। তাহলে এই এতো পরিচয়,এত গর্ব -এসব কোথা থেকে এলো? সমাজ দিয়েছে মানুষ শিখিয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনটা তার সাথে যাবে?
রনি ধীরে ধীরে কবরের দিকে তাকালো। মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষটা এখন কিছুই নিতে পারেনি।না তার টাকা,না তার সম্মান,না তার “হাজী”নাম। তাহলে কী গেছে তার সাথে? হয়তো তার ভাল-মন্দ কাজ। হঠাৎ রনির মনে পড়ে গেল একটা গান -“আসবার কালে কী জাত ছিলে, এসে তুমি কী জাত নিলে,কী জাত হবে যাবার বেলা”।
সে এতদিন পর গানের লাইনটা শুধু গান হিসেবে শুনেছে।আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করলো -সে বুঝতে পারলো-জন্মের সময় তার কোনো জাত ছিল না। মৃত্যুর পরও তার কোনো জাত থাকবে না। মাঝখানের এই সময়টাই আসল। এখানেই ঠিক হয়,সে কেমন মানুষ হয়ে উঠলো।রনির চোখটা ভিজে গেল। সে ভাবলো।
“আমি যদি মরে যাই, মানুষ আমাকে কীভাবে মনে রাখবে?”ভালো মানুষ হিসেবে?নাকি শুধু একটা নাম হিসেবে? কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে কবর থেকে ধীরে ধীরে সরে এলো।আজ সে বুঝতে পারছে। পরিচয় দিয়ে মানুষ বড় হয় না,কর্মটা ভালো করতে হয়। তাহলে মানুষ তাকে মনে রাখবে।

শিক্ষনীয় একটি গল্প। ভালো লাগলো পড়ে