গ্রামের নাম ছিল শালবন। চারদিকে ঘন জঙ্গল, মাঝখানে ছোট্ট এক জনপদ। দিনের বেলায় গ্রামটি ছিল শান্ত, কিন্তু রাত নামলেই সবাই দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়ত। কারণ বহু বছর ধরে একটি ভয়ঙ্কর গুজব প্রচলিত ছিল—জঙ্গলে নাকি এক রাক্ষসী নারী বাস করে।
গ্রামের বয়স্করা বলত, গভীর রাতে কেউ যদি জঙ্গলের দিক থেকে কোনো নারীর কান্নার শব্দ শুনতে পায়, তাহলে তার আর ফিরে আসা হয় না।
তবে এসব গল্পে বিশ্বাস করত না যুবক কাঠুরে রুদ্র। সে সাহসী ছিল, আর কুসংস্কারকে ভয় পেত না।
একদিন সন্ধ্যায় কাঠ কাটতে কাটতে সে জঙ্গলের অনেক ভেতরে চলে গেল। হঠাৎ সে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। একটি পুরনো বটগাছের নিচে সাদা পোশাক পরা এক সুন্দরী নারী বসে কাঁদছে।
রুদ্র এগিয়ে গিয়ে বলল,
— কে আপনি? কেন কাঁদছেন?
নারীটি মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে ছিল গভীর দুঃখ।
— আমি পথ হারিয়েছি।
রুদ্র তাকে গ্রামের দিকে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু নারীটি মাথা নাড়ল।
— আমি গ্রামে যেতে পারি না।
— কেন?
— কারণ গ্রামের মানুষ আমাকে দেখলে ভয় পাবে।
রুদ্র অবাক হলো। এত সুন্দর একজন মানুষকে দেখে কেউ ভয় পাবে কেন?
ঠিক তখনই দূরে বজ্রপাত হলো। বিদ্যুতের আলোয় রুদ্র দেখল নারীর ছায়া নেই।
তার বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হলো।
নারীটি মৃদু হেসে বলল,
— এখনো কি আমার সঙ্গে যেতে চাও?
রুদ্র সাহস করে বলল,
— আপনি মানুষ না হলেও আপনার চোখে কষ্ট দেখছি। আমি ভয় পাচ্ছি, কিন্তু আপনাকে একা রেখে যেতে পারব না।
নারীর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
অনেক বছর আগে তার নাম ছিল চন্দ্রাবতী। সে ছিল এক জমিদারের কন্যা। এক লোভী তান্ত্রিক তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। চন্দ্রাবতী রাজি না হওয়ায় তান্ত্রিক অভিশাপ দিয়েছিল—
“তুমি মানুষের রূপে থাকবে, কিন্তু তোমার আত্মা রাক্ষসীর মতো বন্দি হয়ে থাকবে এই জঙ্গলে।”
সেই থেকে সে শত বছর ধরে মুক্তির অপেক্ষায় ছিল।
রুদ্র প্রতিদিন তার সঙ্গে দেখা করতে লাগল। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব জন্ম নিল। তারপর সেই বন্ধুত্ব ভালোবাসায় পরিণত হলো।
কিন্তু জঙ্গলের অন্ধকার শক্তি এই ভালোবাসা মেনে নিতে পারল না।
এক পূর্ণিমার রাতে তান্ত্রিকের অভিশাপ জেগে উঠল। চন্দ্রাবতীর শরীর বদলে যেতে শুরু করল। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে গেল, দাঁত লম্বা হয়ে উঠল, আর চারপাশে ঝড় শুরু হলো।
সে চিৎকার করে বলল,
— রুদ্র, পালিয়ে যাও! আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না!
কিন্তু রুদ্র পালাল না।
সে চন্দ্রাবতীর হাত ধরে বলল,
— আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।
হঠাৎ আকাশে তীব্র আলো দেখা দিল। গ্রামের পুরনো মন্দিরের ঘণ্টা নিজে থেকেই বাজতে লাগল।
কথিত ছিল, সত্যিকারের ভালোবাসা কোনো অভিশাপের চেয়েও শক্তিশালী।
রুদ্রের ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের শক্তিতে অভিশাপ ভেঙে গেল। ঝড় থেমে গেল। চন্দ্রাবতীর রাক্ষসী রূপ মিলিয়ে গেল।
বহু শতাব্দীর বন্দিদশা থেকে সে মুক্তি পেল।
পরদিন ভোরে গ্রামের মানুষ দেখল, জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র ও চন্দ্রাবতী। আর সেই পুরনো বটগাছটি শুকিয়ে ধুলো হয়ে গেছে।
সেদিনের পর থেকে শালবনের জঙ্গল আর ভয়ের জায়গা ছিল না।
তবে গ্রামের বৃদ্ধরা আজও রাতে আগুনের পাশে বসে গল্প করে—
“রাক্ষসী নারী সত্যিই ছিল। কিন্তু সে কাউকে হত্যা করেনি। তাকে মুক্তি দিয়েছিল একজন মানুষের ভালোবাসা।”
আর পূর্ণিমার রাতে, জঙ্গলের পথ দিয়ে হাঁটলে নাকি এখনো দূর থেকে দুটি মানুষের হাসির শব্দ ভেসে আসে। কেউ বলে, তারা রুদ্র আর চন্দ্রাবতী—যাদের ভালোবাসা অভিশাপকেও হার মানিয়েছিল। 🌕✨📖
