অভিমানের ওপারে ভালোবাসা

0

অভিমানের ওপারে ভালোবাসা

পর্ব–১ : যে ভালোবাসা বলা হয়নি

সকাল সাড়ে নয়টা। “সফটওয়্যার সলিউশন লিমিটেড”-এর অফিসে সবাই কাজে ব্যস্ত। কীবোর্ডের টিকটিক শব্দে পুরো ফ্লোর মুখরিত।

হঠাৎই এক কোণ থেকে চিৎকার ভেসে এল।

— “এই কম্পিউটারটা আবার হ্যাং করল!”

চিৎকারটা শুনেই পাশের ডেস্কে বসা সাবিদ মুচকি হেসে বলল,

— “বুঝে গেছি। চুমকির কম্পিউটার।”

পাশের সহকর্মী রিফাত হেসে বলল,

— “তুই না থাকলে ওর অফিস চলবে না।”

সাবিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

— “চল, দেখি আজ আবার কী করেছে।”

চুমকির ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে বিরক্ত মুখে বলল,

— “হাসছ কেন?”

— “তোমার কম্পিউটারও মনে হয় তোমার মতো রাগী।”

— “একদম ফাজলামি করবে না। আগে এটা ঠিক করো।”

সাবিদ বসে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমস্যা খুঁজে বের করল।

— “এই নাও, হয়ে গেছে।”

চুমকি অবাক হয়ে বলল,

— “এত তাড়াতাড়ি?”

— “আমি আছি না?”

চুমকি মুখে কিছু না বললেও ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

দূর থেকে রিফাত সব দেখে বলল,

— “সাবিদ, তুই অফিসে চাকরি করতে আসিস, নাকি চুমকির পার্সোনাল আইটি ইঞ্জিনিয়ার?”

সবাই হেসে উঠল।

চুমকি লজ্জা পেয়ে বলল,

— “ও নিজেই আসে। আমি ডাকি নাকি?”

সাবিদ মজা করে বলল,

— “তুমি ডাকো না, কিন্তু তোমার কম্পিউটার ডাকে।”

আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।

দুপুরে ক্যান্টিনে।

চুমকি একা বসে ভাত খাচ্ছিল।

সাবিদ ট্রে হাতে নিয়ে এসে বলল,

— “এখানে বসতে পারি?”

— “ক্যান্টিনটা কি আমার?”

— “তাহলে অনুমতি পেয়ে গেলাম।”

বসে পড়তেই চুমকি চোখ রাঙিয়ে বলল,

— “একটু শান্তিতে খেতে দেবে?”

— “তুমি শান্তিতে থাকলে তো আমি অশান্তিতে থাকি।”

চুমকি চামচটা নামিয়ে বলল,

— “তোমার সমস্যা কী?”

— “সমস্যা একটা আছে।”

— “কী?”

— “তুমি কখনও হাসো না।”

চুমকি এবার হেসে ফেলল।

— “অসহ্য!”

সাবিদ মনে মনে বলল,

“এই হাসিটুকুর জন্যই তো প্রতিদিন অপেক্ষা করি।”

কিন্তু মুখে কিছু বলল, না।

অফিসে সবাই জানত, সাবিদ চুমকিকে ভালোবাসে।

শুধু চুমকিই বুঝতে চাইত না।

একদিন রিফাত জিজ্ঞেস করল,

— “কবে বলবি ওকে?”

সাবিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— “যদি বন্ধুত্বটাই হারিয়ে ফেলি?”

— “তবু বল।”

— “না। ওর হাসি হারাতে চাই না। দূরে চলে গেলে আমি বাঁচব না।”

কয়েক দিন পর

চুমকির ডেস্কটপ বারবার হ্যাং করতে লাগল।

সে বিরক্ত হয়ে বলল,

— “আবার সমস্যা!”

সাবিদ ক্যান্টিন থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত নিয়ে এসে বলল,

— “এই নাও, আগে এটা খাও। তারপর কম্পিউটার দেখি।”

চুমকি বলল,

— “দরকার নেই।”

— “এক চুমুক খেলেই হবে।”

— “না।”

সাবিদ দুষ্টুমি করে গ্লাসটা তার মুখের সামনে ধরল।

— “এই নাও…”

চুমকি বিরক্ত হয়ে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতেই—

ছপাৎ!

পুরো শরবত মনিটর আর সিপিইউর ওপর পড়ে গেল।

মুহূর্তেই পুরো অফিস চুপ।

চুমকি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

— “সব সময় ফাজলামি! কে বলেছিল এসব করতে?”

সাবিদ শান্ত গলায় বলল,

— “আমি তো শুধু…”

— “চুপ! তোমার জন্য কম্পিউটারটা নষ্ট হয়ে গেল।

সব সময় আমার পেছনে ঘুরো কেন? বিরক্ত লাগে!”

অফিসের সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সাবিদ আর কোনো কথা বলল, না।

শুধু মাথা নিচু করে মনিটারটা মুছতে লাগল।

আইটি বিভাগে ফোন করে বলল,

— “কম্পিউটারটা রিপেয়ার করুন।

খরচটা আমার বেতন থেকে কেটে নেবেন।”

চুমকি তখনও রাগে ফুঁসছে।

কিন্তু সাবিদ একবারও তার দিকে তাকাল না।

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে সাবিদ এইচআর বিভাগে গেল।

— “স্যার যদি সম্ভব হয় আমাকে দ্বিতীয় তলায় ট্রান্সফার করে দিন।”

— “হঠাৎ কেন?”

সাবিদ মৃদু হেসে বলল,

—”এমনিতেই স্যার।”

সেই রাতেই বাড়ি ফিরে সে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার—সব বন্ধ করে দিল।

ফোনটা বিছানায় রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “ভালোবাসা মানেই কাছে পাওয়া নয়। কখনও কখনও দূর থেকে ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, না জেনেই, চুমকির জীবনে শুরু হয়ে গেল এক অদ্ভুত শূন্যতার গল্প

পর্ব–২ : দূরত্বের শুরু, ভালোবাসার উপলব্ধি

পরদিন সকাল।

চুমকি প্রতিদিনের মতো অফিসে এসে নিজের ডেস্কে ব্যাগটা রাখল।

তারপর অভ্যাসবশত পাশের চেয়ারের দিকে তাকাতেই থমকে গেল।

সেখানে সাবিদ নেই।

তার বদলে অন্য একজন সহকর্মী বসে কম্পিউটারে কাজ করছে।

চুমকি অবাক হয়ে বলল,

— “মাফ করবেন, সাবিদ কোথায়?”

সহকর্মী মাথা তুলে বলল,

— “ওকে দ্বিতীয় তলায় ট্রান্সফার করা হয়েছে।”

— “কখন?”

— “গতকাল বিকেলেই।”

চুমকি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মনে মনে বলল,

“আমাকে একবার বলারও প্রয়োজন মনে করল না?”

তারপর নিজেকে শক্ত করে কাজে বসে পড়ল।

“যাক, ভালোই হয়েছে। এখন অন্তত কেউ বিরক্ত করবে না।”

কিন্তু সেদিন অফিসটা কেমন যেন অচেনা লাগছিল।

কেউ এসে বলল, না-

“চা খাবে?”

কেউ বলল, না—

“কম্পিউটার ঠিক আছে তো?”

কেউ হাসিয়ে দিল না।

দিনটা যেন অনেক বড় হয়ে গেল।

দুই দিন কেটে গেল।

তৃতীয় দিন রাতে চুমকি বিছানায় শুয়ে ফোনটা হাতে নিল।

ম্যাসেঞ্জার খুলে দেখল।

কোনো নতুন মেসেজ নেই।

সে নিজেই অবাক হয়ে বলল,

— “আজও একটা নক দিল না?”

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সাবিদের ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকল।

Last Active: ৩ দিন আগে।

চুমকি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “এত ব্যস্ত নাকি?”

কিন্তু কেন জানি বুকের ভেতরটা হালকা ব্যথা করে উঠল।

পরদিন।

দুপুরে কাজের অজুহাতে চুমকি দ্বিতীয় তলায় উঠল।

দূর থেকেই দেখল, সাবিদ ল্যাপটপে মন দিয়ে কাজ করছে।

তার পাশে বসে আছে এক মেয়ে।

মেয়েটি কিছু একটা বলছে, আর সাবিদ হাসিমুখে উত্তর দিচ্ছে।

চুমকির বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

— “ভেতরে আসব?”

মেয়েটি মুখ তুলে হেসে বলল,

— “আরে, তুমি চুমকি না? ভিতরে এসো। আমি নাদিয়া।”

সাবিদ তখনও ফাইল সেভ করছিল।

কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে চুমকিকে দেখে বলল,

— “তুমি!”

— “একটু বাইরে আসবে?”

— “এক মিনিট।”

সাবিদ বাইরে এল।

চুমকি হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

— “চার দিন হয়ে গেল। অনলাইনে নেই কেন?”

— “কাজ ছিল।”

— “একটা নকও দেওয়া যায় না?”

— “ভাবলাম, তোমাকে আর বিরক্ত না করাই ভালো।”

চুমকি চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— “একতলা ছেড়ে এখানে এলে কেন?”

সাবিদ শান্ত গলায় বলল,

— “আমি নিজেই এসেছি।”

— “কেন?”

— “সব সময় কাছে থাকলে যদি কারও বিরক্ত লাগে,

তাহলে দূরে থাকাই ভালো।”

কথাটা শুনে চুমকির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

তবু সে সেটা প্রকাশ করল না।

বরং জিজ্ঞেস করল,

— “তোমার পাশে নাদিয়া কেন”?

— “নাদিয়া। আমার টিমমেট।”

— “বেশ ভালোই তো গল্প করছিলে।”

সাবিদ হেসে বলল,

— “গল্প না। অফিসের কাজ।”

ঠিক তখনই নাদিয়া দরজার কাছে এসে বলল,

— “সাবিদ, রিপোর্টটা একবার দেখবে?”

— “আসছি।”

চুমকি ঠান্ডা গলায় বলল,

— “যাও। তোমার জন্য তো কেউ অপেক্ষা করছে।”

সাবিদ একটু থেমে বলল,

— “করতেই পারে। আমরা একই টিমে কাজ করি।”

চুমকির মুখটা শক্ত হয়ে গেল।

— “বাহ! বেশ মিল তো!”

সাবিদ বুঝতে পারছিল, চুমকি রেগে গেছে।

তবু কিছু বলল, না।

শুধু বলল,

— “আচ্ছা, ভালো থেকো।”

সে ভেতরে চলে গেল।

চুমকি করিডোরে একা দাঁড়িয়ে রইল।

প্রথমবার তার মনে হলো—

“সাবিদ কি সত্যিই আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে?”

সেদিন বিকেলে নাদিয়া ইচ্ছে করেই চুমকির ডেস্কে এল।

— “চুমকি, একটু বসতে পারি?”

— “বসুন।”

নাদিয়া মুচকি হেসে বলল,

— “জানো, সাবিদ মানুষটা সত্যিই দারুণ।”

চুমকি ভ্রু কুঁচকে বলল,

— “তাই?”

— “হ্যাঁ। অফিসে আমার কম্পিউটারে সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দেয়। সবাইকে হাসায়। এমন মানুষ খুব কম দেখা যায়।”

চুমকি শুধু “হুম” বলল।

নাদিয়া আবার বলল,

— “আজ অফিস শেষে আমি আর সাবিদ চিড়িয়াখানায় যাওয়ার কথা ভাবছি। তুমি যাবে?”

চুমকি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

— “না। আমার সময় নেই।”

— “আচ্ছা, পরে দেখা হবে।”

নাদিয়া চলে গেল।

চুমকি আবার কম্পিউটারের সামনে বসল।

কিন্তু চোখে শুধু একটাই ছবি—

সাবিদ আর নাদিয়া পাশাপাশি বসে হাসছে।

সেদিন প্রথমবার সে নিজের মনকে প্রশ্ন করল,

“আমি কি সত্যিই শুধু বন্ধুর জন্য এত কষ্ট পাচ্ছি?”

কিন্তু উত্তরটা সে তখনও জানত না।

শুধু জানত…

সাবিদকে অন্য কারও সঙ্গে দেখলে তার ভীষণ কষ্ট হয়।

পর্ব–৩ : অভিমান যখন ভালোবাসার ভাষা হয়ে ওঠে

শুক্রবার সকাল।

অফিস বন্ধ। কিন্তু সকাল থেকেই চুমকির মনটা অস্থির।

বারবার মনে হচ্ছে, একবার যদি সাবিদকে দেখা যেত!

অনেক ভেবেচিন্তে সে সকাল আটটার দিকে সাবিদদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুললেন সাবিদের মা।

— “আরে চুমকি! এসো মা।”

চুমকি মৃদু হেসে বলল,

— “আন্টি, সাবিদ আছে?”

— “আছে তো। এখনও ঘুমাচ্ছে। আজকাল অফিসে খুব কাজের চাপ। রাত এগারোটার আগে ঘুমায় না। তুই ওর ঘরে যা।”

চুমকি ধীরে ধীরে সাবিদের ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরটা আগের মতোই গুছানো।

টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে কয়েকটা অফিস ফাইল।

বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সাবিদ।

চুমকি কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

মনে মনে বলল,

“কেমন জানি হয়ে গেল আমাদের জীবনটা।”

বিছানার পাশে রাখা ফোনটা তার চোখে পড়ল।

কৌতূহলবশত ফোনটা হাতে তুলে কল লিস্ট দেখল।

সে খুঁজছিল একটাই নাম—নাদিয়া।

কিন্তু না।

নাদিয়ার কোনো ব্যক্তিগত কল নেই। অফিসের দু-একটা কল ছাড়া আর কিছুই নেই।

চুমকির বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল।

সে আলতো করে বলল,

— “এই সাবিদ… ওঠো।”

কোনো উত্তর নেই।

আবার ডাকল,

— “এই ঘুমকাতুরে! ওঠো।”

হঠাৎ সাবিদ ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বলল,

— “চুপ কর, নাদিয়া… আর পাঁচ মিনিট…”

চুমকির মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।

— “বাহ! স্বপ্নেও নাদিয়া!”

ঠিক তখনই সাবিদের ঘুম ভাঙল।

চোখ খুলে সামনে চুমকিকে দেখে সে লাফিয়ে উঠে বসল।

— “চু… চুমকি! তুমি!”

— “হ্যাঁ। কিন্তু তুমি তো অন্য কাউকে খুঁজছিলে।”

— “আরে না! কাল অফিসে রিপোর্ট নিয়ে নাদিয়া বারবার বলছিল। তাই হয়তো…”

— “ব্যাখ্যা দিতে হবে না।”

-“যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।”

“চুমকি ডাইনিং এর পাশে দাঁড়িয়ে র‌ইল।”

ফ্রেশ হয়ে সাবিদ‌ও ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।

তার মা গরম পরোটা আর ডিম ভাজি পরিবেশন করলেন।

সাবিদ হেসে বলল,

— “মা, আজ ডিম ভাজি?”

— “চুমকি এসেছে বলে বানিয়েছি। ও তো খুব পছন্দ করে।”

সাবিদ চুমকির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “এসো, নাস্তা করো।”

চুমকি মুখ ফিরিয়ে বলল,

— “খিদে নেই।”

ঠিক তখনই সাবিদের ফোন বেজে উঠল।

তার মা ফোনটা হাতে নিয়ে বললেন,

— “দেখ, নাদিয়া ফোন করেছে।”

চুমকি মুখ শক্ত করে বসে রইল।

সাবিদ ফোন ধরল।

— “হ্যালো, বলো।”

ওপাশ থেকে নাদিয়া বলল,

— “গতকালের রিপোর্টটা শেষ করেছ?”

— “না। নাস্তা করছি। খেয়ে ল্যাপটপ খুলব।”

— “আচ্ছা, হয়ে গেলে আমাকে জানিও।”

— “ঠিক আছে।”

ফোনটা রাখতেই চুমকি ঠান্ডা গলায় বলল,

— “অসাধারণ! এখন তো ছুটির দিনেও ফোনে কথা হয়।”

সাবিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— “চুমকি, অফিসের কাজ ছিল।”

— “আর নাদিয়া তো খুব ভালো মেয়ে, তাই না?”

— “হ্যাঁ, ও ভালো সহকর্মী।”

চুমকি ব্যঙ্গ করে হেসে বলল,

— “তাহলে এক কাজ করো। ওর বাড়ির পাশেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকো।”

সাবিদ চুপ করে গেল।

তার মা দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন,
কোথাও একটা বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

চুমকি অভিমান করে বাড়ি ফিরে এল।

সারাদিন দরজা বন্ধ করে বসে রইল।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা।

এক ফোঁটা পানিও মুখে দিল না।

কান্না করতে করতে জ্বর এসে গেল।

চুমকির মা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,

— “মা, কী হয়েছে? আমাকে বল।”

চুমকি শুধু বলল,

— “কিছু না।”

ঠিক তখনই তার ছোট বোন ঘরে ঢুকে বলল,

— “আমি জানি কী হয়েছে।”

চুমকি চোখ রাঙিয়ে বলল,

— “চুপ!”

ছোট বোন হেসে বলল,

— “তুমি রাগ করবে জানি। তবু বলছি।”

সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “সাবিদ ভাইয়া আপুকে অনেক ভালোবাসে।

কিন্তু আপু কখনো বুঝল না।

উল্টো অফিসে সবাইয়ের সামনে অপমান করল। তাই ভাইয়া ডেস্ক বদলে ফেলেছে। এখন ওর পাশে নাদিয়া আপু বসে।”

চুমকির মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

চুমকি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

কান্নায় ভেঙে পড়ল।

— “মা… ও যদি সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলে?”

চুমকির মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

— “তুই কি ওকে ভালোবাসিস?”

চুমকি চোখের জল মুছে ফিসফিস করে বলল,

— “জানি না কখন… কিন্তু এখন ওকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না।”

চুমকির মা আর দেরি করলেন না।

তিনি ফোন বের করে সাবিদের মাকে কল করলেন।

— “আপা… চুমকির খুব জ্বর। কেঁদেই যাচ্ছে। কিছু খাচ্ছে না। যদি পারেন, সাবিদকে নিয়ে একটু আসবেন। মনে হয়, ওর কথাই শুধু শুনবে।”

ফোন রাখার পর চুমকি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন—

“সাবিদ কি আসবে?”

আর সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে শুরু হতে চলেছে তাদের জীবনের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়

পর্ব–৪ : ভালোবাসার স্বীকারোক্তি

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।

সাবিদের মা ফোন রেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— “সাবিদ, চুমকির খুব জ্বর। কিছু খাচ্ছে না। সারাদিন কাঁদছে।”

সাবিদ যেন চমকে উঠল।

— “কী বলছ মা?”

— “চল, একবার দেখে আসি।”

আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।

পনেরো মিনিটের মধ্যেই তারা চুমকিদের বাড়িতে পৌঁছে গেল।

দরজা খুললেন চুমকির মা।

চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

— “এসো বাবা। ও দুপুর থেকে কিছুই খায়নি। ওষুধও খেতে চাইছে না।”

সাবিদ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

— “আমি কি ওর সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”

— “অবশ্যই। যাও।”

ধীরে ধীরে চুমকির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সাবিদ।

আলতো করে দরজায় নক করল।

টক… টক…

ভেতর থেকে দুর্বল গলায় ভেসে এল,

— “কে?”

— “আমি… সাবিদ।”

দরজার ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল।

চুমকির মুখটা জ্বরে লাল হয়ে আছে।

চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে।

সাবিদের বুকটা হুহু করে উঠল।

— “এ কী অবস্থা তোমার?”

চুমকি মুখ ফিরিয়ে বলল,

— “তোমার কী?”

— “খাওনি কেন?”

— “আমার জন্য চিন্তা করতে হবে না।”

— “জ্বর নিয়ে না খেয়ে থাকলে শরীর আরও খারাপ হবে।”

চুমকি ঠান্ডা গলায় বলল,

— “তুমি বরং যাও। তোমার নাদিয়া খেয়েছে কিনা দেখে এসো।”

সাবিদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর পকেট থেকে ফোন বের করল।

— “আচ্ছা, তাহলে ওকেই একটা ফোন করি।”

নম্বর খুঁজতে শুরু করতেই চুমকি রাগে এগিয়ে এল।

ফোনটা কেড়ে নিয়ে বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলল।

তারপর দুই হাতে সাবিদের পাঞ্জাবির কলার শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলল,

— “তোমাকে কতবার বলেছি, আমার সামনে অন্য কোনো মেয়ের নাম নেবে না!”

সাবিদ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

চুমকির চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।

সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— “তুমি বুঝতে পারো না? ওর নাম শুনলেই আমার বুকের ভেতর কষ্ট হয়। তোমাকে অন্য কারও সঙ্গে ভাবতেই পারি না।”

সাবিদ নরম গলায় বলল,

— “চুমকি…”

— “না, আজ আমাকে বলতে দাও।”

চুমকি মাথা নিচু করে বলল,

— “আমি খুব বোকা ছিলাম। তুমি এতদিন ধরে আমাকে ভালোবেসেছ, আর আমি শুধু তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।
অফিসে তোমাকে সবার সামনে অপমান করেছি।”

সে ফুঁপিয়ে উঠল।

— “আমাকে ক্ষমা করবে?”

সাবিদ ধীরে ধীরে তার চোখের জল মুছে দিল।

— “ক্ষমা তো তাকে করা হয়, যে ইচ্ছে করে কষ্ট দেয়। তুমি রাগের মাথায় ভুল করেছিলে।”

চুমকি কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

— “তবুও তুমি আমার ওপর রাগ করোনি?”

— “তোমার ওপর রাগ করে থাকতে পারিনি কোনো দিন।”

চুমকি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে মাথাটা সাবিদের বুকে রেখে কাঁদতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর সাবিদ মৃদু হেসে বলল,

— “আচ্ছা, এবার ছাড়ো।”

চুমকি মাথা তুলল।

— “কেন?”

— “বাইরে দুই মা আর তোমার ছোট বোন দাঁড়িয়ে আছে।

সবাই যদি আমাদের এভাবে দেখে, কী ভাববে?”

চুমকি লজ্জায় তাড়াতাড়ি হাত ছেড়ে দিল।

ঠিক তখনই দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে চুমকির ছোট বোন বলল,

— “আমি কিন্তু সব দেখেছি!”

চুমকি বালিশ ছুড়ে মারতেই সে হাসতে হাসতে পালিয়ে গেল।

ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই মা-ও মুচকি হেসে ফেললেন।

সাবিদ আবার চুমকির দিকে তাকিয়ে বলল,

— “তবে তোমার জন্য একটা সুখবর আছে।”

চুমকি বিস্মিত হয়ে বলল,

— “কী সুখবর?”

— “আজ তোমার মা আর আমার মা অনেকক্ষণ কথা বলেছেন।”

— “তারপর?”

— “তারা বলেছেন, আমরা যদি রাজি থাকি, তাহলে আর দেরি করার কোনো মানে নেই।”

চুমকির বুক ধুকপুক করতে লাগল।

— “মানে…?”

সাবিদ মুচকি হেসে বলল,

— “আমাদের বিয়ের কথা দুই পরিবার ঠিক করে ফেলেছে।”

চুমকির চোখ আবার ভিজে উঠল।

— “সত্যি?”

— “হ্যাঁ। তবে এবার একটা শর্ত।”

— “কী?”

— “এরপর থেকে আর কোনো ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না।”

চুমকি আলতো করে তার হাত ধরল।

— “আর তুমিও আমার সামনে অন্য কোনো মেয়ের নাম নেবে না।”

সাবিদ হেসে বলল,

— “ঠিক আছে।”

ঠিক তখনই বাইরে থেকে নাদিয়ার ভিডিও কল এল।

সাবিদ ফোনটা স্পিকারে ধরতেই নাদিয়া হেসে বলল,

— “কী খবর? সব ভুল বোঝাবুঝি মিটেছে?”

চুমকি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

— “হ্যাঁ… আর তোমার কাছে একটা ‘সরি’ পাওনা রইল।”

নাদিয়া হেসে উত্তর দিল,

— “সরি নয়। শুধু একটা কথা মনে রেখো—যে মানুষটা তোমাকে এত ভালোবাসে, তাকে আর কখনো কাঁদিও না।”

চুমকি সাবিদের হাত শক্ত করে ধরে বলল,

— “কাঁদাব না… কথা দিলাম।”

সেদিন রাতেই দুই পরিবারের মুখে হাসি ফুটল। আর বহু দিনের অভিমান গলে গিয়ে জায়গা করে নিল এক নতুন শুরুর—ভালোবাসার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here