গল্প –মধুর বন্ধন
কলমে –সুদীপ ভড়
আজ রাখি বন্ধন উৎসব। রাখি বন্ধন কী সেটা আপামর ভারতবাসী সবাই জানে। রাখি বন্ধন উৎসবের প্রচলনের সঠিক ইতিহাস নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। তবে রাখিবন্ধন উৎসবকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন, এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই।
আজকাল শহর গ্রামে এই উৎসব মহাসাড়ম্বরে পালন করা হচ্ছে। আজ মিনতির অফিসেও রাখিবন্ধন উৎসব ছিল। মিনতি থাকে শহরের দুর্গাবস্তির পাশে একটা ছোট্ট বাড়িতে। বাড়িতে থাকে বৃদ্ধ বাবা, মা ও সে। বৃদ্ধ মা একটি বাড়িতে আয়ার কাজ করে। আর বৃদ্ধ বাবা বছরখানেক হলো ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। ফলে বাবার চিকিৎসার খরচ ও সংসার খরচ চালানোর জন্য মিনতির একটা কাজ ভীষণ প্রয়োজন ছিল। সপ্তাহখানেক হলো একটি প্রাইভেট সেক্টরে সে একটা কাজ পেয়েছে। কম্পিউটার জানা মিনতি প্রথমেই ঢুকে মহিনা মোটামুটি ভালো, তবে প্রায় বারো ঘন্টা ডিউটি করতে হয়। সকাল আটটা থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা বেজে যেত প্রতিদিনই। রাত্রি দশটার সময় বাসস্ট্যান্ডে নেমে জনশূন্য রাস্তায় গলির পথ ধরে একা একটা মেয়ে হেঁটে যাওয়া আজকের দিনে খুবই বিপদজনক। কারণ রাতের বেলায় রাস্তার কুকুর গুলো থেকে মনুষ্যরূপী কুকুর গুলোর উৎপাত বেশি থাকে। তার ওপর যদি একটু সুন্দরী হয় তাহলে বিপদের সম্ভাবনা আরো বেশি বেড়ে যায়। তবুও মিনতির মনের সাহস ও বাধ্যবাধকতা তাকে মেনে নিতে বাধ্য করেছিল।
আজ অফিসে রাখিবন্ধন ছিল বলে একটু আগেই অফিস ছুটি হয়েছে। তবুও রাস্তায় জ্যাম থাকায় বাসস্ট্যান্ডে আসতে প্রায় দশটাই বেজে গেল। বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দশমিনিট গলির মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে তবে তার বাড়ি। সপ্তাখানেক ধরে একটা অনুভব করতে পারছিল যে, কেউ বা কারা তার উপর নজর রাখছে। যাইহোক বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমে মিনতি বেশ জোরেই হাঁটা শুরু করলো। বেশ খানিকটা আসার পর গলির একটা বাঁকে যেখানটা একটু বেশি অন্ধকার থাকে সেই জায়গায় চারটে ছেলে তার সামনে এসে উপস্থিত হলো। সে খুব প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল, কী করবে ভেবে উঠতে পারছিল না। ছেলেগুলোর চোখ লালসায় পরিপূর্ণ ছিল। এমনভাবেই তাকে ঘিরে ধরেছে যে, সে সামনে কিংবা পিছনে ছুটে যেতে পারবে না। হঠাৎই একজন তার ওড়নাটা ধরে ফেলল। তখন সে চিৎকার করে বলে উঠলো “কারা তোমরা, কী চাই তোমাদের ?” তখন তারা চারজনেরই অট্টহাসি হাসতে লাগলো। তারপর তার দুটো হাত দুজনে মিলে চেপে ধরল আর বাকি দুজনে তার উপর হিংস্র পশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার চিৎকারে নিস্তব্ধ গলি ফেটে পড়ল। তা চিৎকার শুনে বাড়ির জানালা দিয়ে লোকজন দেখেও, না দেখার ভান করে জানালা বন্ধ করে দিল। কেউই তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল না। মিনতি নিজেকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। হঠাৎই আবির্ভাব হল একটি ছেলের। সে সেই চারজন গুন্ডার সাথে লড়াই করতে শুরু করলো। তার কয়েক ঘা মার খেয়ে বাধ্য হয়ে চারজন গুন্ডা মিনতিকে ছেড়ে পালালো। তারপর মিনতিকে মাটি থেকে তুলে একটা জায়গায় বসালো। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে জল খাওয়ালো। জল খেতে খেতে মিনতি ছেলেটিকে বলল,” কে তুমি, তোমার নাম কী ভাই, কোথায় থাকো?” ছেলেটি বলল,”আমার নাম ইকবাল। আমি গ্রামে থাকি, কাজের জন্য শহরে এসেছি। এখনো পর্যন্ত একটা কাজ জোটাতে পারেনি। একটা পয়সাও নেই যে, কোথাও হোটেলে থাকবো তাই এই ফুটপাতেই থাকি।”মিনতি বললো, “তুমি মুসলিম হয়েও একটি হিন্দু মেয়ের সম্মান রক্ষা করেছো। যেটা এক ভাই তার বোনকে করে। তার প্রতিদান স্বরূপ, যদি কিছু মনে না করো আজ রাখিবন্ধন, আমার ব্যাগে এখনও একটা রাখি রয়েছে, সেই রাখিটা তোমার হাতে পড়িয়ে দিতে চাই। ছেলেটি বলল,” আমার কোনো বোন বা দিদি নাই, তুমি আমাকে ভাই বলে ডেকেছো। তাই তোমার হাতে রাখি পড়তে আমার কোনো আপত্তি নেই। তখন মিনতি ব্যাগ থেকে রাখিটা বের করে ইকবালের হাতে পড়িয়ে দিল এবং তার ব্যাগে রাখা মিষ্টি বের করে ইকবালকে খাইয়ে দিল। তারপর মিনতি ইকবালকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল এবং তার মা-বাবা সকলকে আজকের এই ঘটনাটা সব খুলে বলল। মিনতির বাবা-মাও ইকবালকে নিজের সন্তান বলে মেনে নিল। পরে মিনতির অফিসেই ইকবালের একটা কাজ জুটে গেল।
এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, রাখিবন্ধন উৎসব ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে । ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাখিবন্ধনের সূচনা করেছিলেন, আজ তারই পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
