নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: সাফল্যের ইমারত একদিনে তৈরি হয় না, তার জন্য প্রয়োজন হয় ইস্পাতকঠিন সংকল্প আর নিরলস সাধনা। মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পীঠস্থান বহরমপুর শহরের তেমনই এক উদীয়মান প্রতিভা শুভজিৎ মণ্ডল। ১৯৯৭ সালের ১০ই আগস্ট নিশিকান্ত মণ্ডল ও স্মৃতিকা মণ্ডলের ঘর আলো করে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আজ কেবল একটি নাম নন, বরং মেধা ও সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শিকড়ের সন্ধানে শিক্ষার মজবুত ভিত
শুভজিতের সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তাঁর শৈশবেই। পাঠভবন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সুশৃঙ্খল পরিবেশে তাঁর জীবনবোধ গড়ে ওঠে। এরপর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বহরমপুর কলেজ থেকে ২০১৮ সালে বাংলায় স্নাতক এবং ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। মাতৃভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর এই গভীর অনুরাগই তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
প্যাশন যখন পেশা: সৃজনশীল সত্তার বিকাশ
প্রথাগত পড়াশোনার চাপে অনেকেই শখ হারিয়ে ফেলেন, কিন্তু শুভজিৎ ব্যতিক্রম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা ও অঙ্কন শিল্পের প্রতি তাঁর ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ। নিজের মনের ভাবকে কলমের কালি ও তুলির টানে ফুটিয়ে তোলার যে অভ্যাস তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ‘গপ্পোবাগীশ’ প্রকাশনীতে বিভিন্ন সংকলনে নিজের লেখা প্রকাশের মাধ্যমে যে যাত্রার শুরু, আজ তা বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে।
সাফল্যের আকাশছোঁয়া মাইলফলক: বইমেলা থেকে গবেষণাধর্মী সাহিত্য
শুভজিতের সম্পাদনায় একের পর এক কালজয়ী সংকলন সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বর্ণধারা, অক্ষরস্রোত এবং রোদেলা দিন।
- ২০২৬ সালের ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় তাঁর সম্পাদিত ‘শব্দতরঙ্গ’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), ‘অক্ষরলিপি’ এবং ‘নদীর চুপকথারা’ ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।
সবচেয়ে অনুপ্রেরণার বিষয় হলো তাঁর গবেষণাধর্মী কাজ। NET, SET এবং জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০-এর পাঠ্যক্রম অনুযায়ী তাঁর লেখা ‘গবেষণায় জ্ঞানের তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ’ বইটি শিক্ষার্থীদের জন্য এক আকর গ্রন্থ। ২০২৫ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর মহালয়ার পুণ্য লগ্নে কালীঘাট যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে এই বইটির প্রকাশ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়: এক বছরে ৯টি বই!
ভাবলে অবাক হতে হয়, বিগত মাত্র এক বছরে শুভজিতের মোট ৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং তাঁর রাতের পর রাত জেগে থাকা পরিশ্রম এবং লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকার জীবন্ত দলিল। সামনের দিনগুলোতে তাঁর সম্পাদনায় আসতে চলেছে ‘সৃষ্টিসুখের কপাট’, ‘বাক্যসুখ’ ও ‘ALPHABET’-এর মতো আরও কিছু অনবদ্য সৃষ্টি।
“পরিবারের পাশাপাশি প্রকাশকের সহায়তা থাকলে ভবিষ্যতে অনেক বই এভাবেই পাঠকমহলে উপহার দিতে পারব।” — শুভজিৎ মণ্ডল
শেষ কথা
এত সাফল্যের পরেও শুভজিৎ মাটির কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ। তাঁর এই বিনম্র স্বভাব এবং শিকড়কে আঁকড়ে ধরার মানসিকতা আমাদের শেখায় যে, কঠোর পরিশ্রম করলে স্বপ্ন একদিন খাঁটি সোনায় পরিণত হবেই। শুভজিৎ মণ্ডলের এই সাহিত্যযাত্রা আগামী দিনের অসংখ্য তরুণ লেখক ও স্বপ্নদর্শীদের কাছে এক অন্তহীন প্রেরণা।



