বাংলার ইতিহাস মানেই লড়াইয়ের ইতিহাস। যে মাটিতে জন্মেছিলেন ক্ষুদিরাম বসুর মতো নির্ভীক বিপ্লবী, যে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠেছিল নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার গর্জনে, সেই বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি আজ আমাদের এক গভীর আত্মদর্শনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়েও আজ যখন আমরা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মোড়ে দাঁড়িয়ে অধিকারের লড়াই দেখি, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের সেই বিপ্লবী উত্তরাধিকার কি আজও জীবিত?
অস্তিত্বের সংকট ও রাজনীতির সমীকরণ
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্র এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক সময় বামেরা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, আবার ক্ষমতার অলিন্দে নতুন শক্তিদের দাপট বেড়েছে। কিন্তু রাজনীতির এই ভাঙা-গড়ার খেলায় সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলো কি খুব বদলেছে? শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর কর্মসংস্থানের দাবিগুলো কি আজও সেই ১৯০৮ সালের ক্ষুদিরামের স্বপ্নের ভারতের সাথে খাপ খায়? আজ যখন আমরা ‘বিপ্লব’ শব্দটা শুনি, তখন তা কেবল ভোটের স্লোগান হয়েই ধরা দেয়। কিন্তু সত্যিকারের বিপ্লব কি কেবল বোতাম টেপাতেই সীমাবদ্ধ?###
আদর্শের খরা: কোথায় সেই ‘বিবেক’?
রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছিলেন বিশ্বজনীনতা, নজরুল শিখিয়েছিলেন সাম্য। আজ বাংলা যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন শঙ্খ ঘোষের মতো সেই ‘বিবেক’ কোথায়, যিনি কোনো রাজনৈতিক রঙ না দেখে সপাটে বলতে পারেন— “তুমি অন্যায় করছো”? বর্তমানে বুদ্ধিজীবী সমাজও যেন স্বার্থ আর ভয়-ভীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। তবুও এর মাঝেই দানা বাঁধে নতুন লড়াই। কোনো এক সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারের আন্দোলন হোক, কিংবা সুন্দরবনের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা আদিবাসী মায়ের ভিটে রক্ষার লড়াই—এরাই কি আজকের দিনের প্রকৃত বিপ্লবী নন?
নতুন প্রজন্মের দায়বদ্ধতা
আজকের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদিরামের মতো হাতে বোমা তুলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাঁর সেই ‘আপসহীন’ মানসিকতা আজ বড় বেশি প্রয়োজন। আমাদের লড়াইটা আজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে, আমাদের লড়াইটা আজ মেরুকরণের বিরুদ্ধে। ক্ষমতার লড়াইয়ে দলগুলো যখন একে অপরকে জিরো করতে ব্যস্ত, তখন সাধারণ মানুষের জীবন যেন এক অনিশ্চিত গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
শেষ কথা
পশ্চিমবঙ্গ কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়, এটি একটি চেতনা। ক্ষুদিরাম বসু বা প্রফুল্ল চাকীরা হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছিলেন যাতে উত্তরসূরিরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। আজকের দিনে সত্য বলাটাই সবথেকে বড় বিপ্লব। আপনি তৃণমূলের সমর্থক হন, বিজেপির হোন বা বামেদের—দিনের শেষে প্রশ্নটা কিন্তু একটাই: “আপনার সন্তানদের জন্য আপনি কোন বাংলা রেখে যাচ্ছেন?”অন্ধকার যতই ঘন হোক, ভোরের আলো ফুটবেই। তবে সেই আলো দেখার জন্য প্রয়োজন একুশ শতকের এক নতুন নজরুল, এক নতুন ক্ষুদিরাম। সেই স্ফুলিঙ্গ কি আপনার মধ্যে আছে?
