মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির কথা আমরা পড়ি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরেকটি নীরব ঘাতক প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নিচ্ছিল—ব্যাক্টেরিয়া। নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, ডিফথেরিয়া, সিফিলিস—এমনকি একটি ছোট ক্ষত থেকেও রক্তদূষণ হয়ে মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক কিছু নয়।
একটি শিশু খেলতে গিয়ে হাঁটু ছড়িয়ে ফেললে পরিবার আতঙ্কে দিন গুনত। হাসপাতালের করিডরে সংক্রমণ মানেই প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। চিকিৎসকের হাতে ছিল অ্যান্টিসেপটিক, কিন্তু তা জীবাণুর সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ কোষও ধ্বংস করত। অস্ত্রোপচার ছিল ঝুঁকিপূর্ণ; অপারেশনের পরে সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যকর উপায় ছিল না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অসংখ্য সৈনিক গুলির আঘাতে নয়, বরং ক্ষত সংক্রমণে মারা যান। মানবসভ্যতা বুঝতে পারছিল—আমাদের একটি নতুন অস্ত্র প্রয়োজন। এমন কিছু, যা শরীরের কোষকে রক্ষা করবে কিন্তু ব্যাক্টেরিয়াকে নিশ্চিহ্ন করবে। এই অন্ধকার সময়েই জন্ম নেয় এক আশ্চর্য গল্প — যা শুধু একটি ওষুধের আবিষ্কার নয়, বরং মানবতার ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়।
পেনিসিলিন আসার আগে চিকিৎসকরা ‘অ্যান্টিসেপটিক’ বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করতেন। ১৮৬০-এর দশকে জোসেফ লিস্টার কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার শুরু করেছিলেন। কিন্তু এই অ্যান্টিসেপটিকগুলোর একটি বড় সমস্যা ছিল। এগুলো ব্যাক্টেরিয়া মারার পাশাপাশি শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা কোষ বা শ্বেত রক্তকণিকাগুলোকেও পুড়িয়ে ফেলত। ফ্লেমিং যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রয়্যাল আর্মি মেডিকেল কোরে কাজ করতেন, তিনি দেখেছিলেন যে গভীর ক্ষতে অ্যান্টিসেপটিক প্রয়োগ করার ফলে জখম আরও বিষিয়ে যাচ্ছে।
তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের এমন কিছু প্রয়োজন যা শরীরের কোষকে সম্মান করবে কিন্তু ব্যাক্টেরিয়াকে সমূলে বিনাশ করবে।
১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। লন্ডনের সেন্ট মেরি’স হাসপাতালের এক সাধারণ গবেষণাগার। সেখানে কাজ করছিলেন স্কটিশ জীবাণুবিজ্ঞানী Alexander Fleming।
ফ্লেমিং ছিলেন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক, কিন্তু খুব গোছানো নন — এ কথা সহকর্মীদের কাছে পরিচিত ছিল। তিনি স্ট্যাফিলোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসে যখন তিনি ফেলে রাখা পেট্রি ডিশগুলো পরীক্ষা করছিলেন, তখনই চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য।
একটি ডিশে একটি নীলচে-সবুজ ছত্রাক জন্মেছে। কিন্তু তার চারপাশে ব্যাক্টেরিয়ার কলোনি নেই। বরং সেখানে একটি পরিষ্কার, স্বচ্ছ বৃত্ত—যেন ছত্রাকটির আশেপাশের জীবাণুগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে।
অনেকেই এটিকে “দূষণ” বলে ফেলে দিতেন, কিন্তু ফ্লেমিং থেমে গেলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন —
“কেন ছত্রাকের আশেপাশে ব্যাক্টেরিয়া বাঁচছে না?”
বিজ্ঞান সেখানেই জন্ম নেয় — যেখানে প্রশ্ন করা হয়।
পরীক্ষা করে তিনি বুঝলেন, ছত্রাকটি (Penicillium Notatum) এমন এক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করছে যা ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করছে। তিনি এই পদার্থের নাম দিলেন — Penicillin।
১৯২৯ সালে তিনি তাঁর আবিষ্কার প্রকাশ করেন। কিন্তু সমস্যাটি ছিল গুরুতর। পেনিসিলিন অত্যন্ত ভঙ্গুর, বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করলেই তা কার্যকারিতা হারাত। ফলে বৈজ্ঞানিক মহলে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া গেল না। আবিষ্কারটি যেন থেকে গেলো সময়ের অপেক্ষায়।
প্রায় এক দশক পরে, ১৯৩৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তিন বিজ্ঞানী এই উপেক্ষিত আবিষ্কারকে নতুন প্রাণ দেন — Howard Florey, Ernst Boris Chain এবং Norman Heatley। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন—যদি পেনিসিলিনকে বিশুদ্ধ ও স্থিতিশীল করা যায়, তবে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আনতে পারে।
ল্যাবরেটরিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ব্রিটেনে অর্থাভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি, গবেষণার সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পেনিসিলিন উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণ তরল মাধ্যমে ছত্রাক চাষ করতে হতো। হিটলি দেখলেন, সাধারণ ল্যাবরেটরির পাত্রে এটি সম্ভব নয়। তিনি তখন পুরো অক্সফোর্ড শহর চষে বেড়ালেন এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের কয়েকশ ‘বেডপ্যান’ বা মলমূত্র ত্যাগের পাত্র জোগাড় করলেন। এই পাত্রগুলো ছিল চ্যাপ্টা এবং প্রশস্ত, যা পেনিসিলিয়াম ছত্রাক জন্মানোর জন্য উপযুক্ত উপরিভাগ প্রদান করত। বিজ্ঞান জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই আবিষ্কারের আঁতুড়ঘর ছিল পরিত্যক্ত কিছু গামলা আর বেডপ্যান!
ছত্রাক জন্মানো সহজ ছিল, কিন্তু সেই হাজার লিটার ছত্রাকের তরল থেকে মিলিগ্রাম পরিমাণ বিশুদ্ধ পেনিসিলিন পাউডার বের করা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। পেনিসিলিন ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর রাসায়নিক। সামান্য তাপমাত্রা বাড়লে বা অম্লত্বের (pH) পরিবর্তন হলে তা নষ্ট হয়ে যেত।
Ernst Boris Chain ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান বায়োকেমিস্ট। তিনি এবং Heatley মিলে ‘ফ্রিজ-ড্রাইং’ বা শীতলীকরণের এক আদিম পদ্ধতি ব্যবহার করে সেই তরল থেকে পেনিসিলিনকে স্ফটিকে রূপান্তর করার চেষ্টা শুরু করলেন। রাতের পর রাত তাঁরা ল্যাবরেটরিতে ঘুমাতেন। অনেক সময় দেখা যেত সারা রাতের পরিশ্রমের পর সকালে উঠে দেখছেন সবটুকু নমুনা নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও তাঁরা দমে যাননি। তাঁদের এই ত্যাগের পরিমাণ এতটাই ছিল যে, ১৯৪০ সালের মে মাসে যখন তাঁরা আটটি ইঁদুরের ওপর সফল পরীক্ষা চালালেন, তখন তাঁদের হাতে পৃথিবীর মোট পেনিসিলিনের পরিমাণ ছিল মাত্র কয়েক চিমটি।
পেনিসিলিনের মানবদেহে প্রথম প্রয়োগের ইতিহাসটি যেমন আশার, তেমনি করুণ। ১৯৪১ সাল। আলবার্ট আলেকজান্ডার নামক এক পুলিশ কনস্টেবল গোলাপ বাগান পরিষ্কার করতে গিয়ে কাঁটার আঘাতে ইনফেকশনে আক্রান্ত হন। তাঁর অবস্থা ছিল শোচনীয়—সারা শরীর পচতে শুরু করেছিল, একটি চোখও তুলে ফেলতে হয়েছিল। ফ্লোরি এবং চেইন ঝুঁকি নিয়ে তাঁর শরীরে প্রথম পেনিসিলিন ইনজেকশন দিলেন। অলৌকিকভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আলবার্ট সুস্থ হতে শুরু করলেন। তাঁর অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে — জ্বর কমে যায়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এই অধ্যায়ের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক তথ্য হলো—তখন পেনিসিলিন এতই মূল্যবান ছিল যে, আলবার্টকে ইনজেকশন দেওয়ার পর ডাক্তাররা তাঁর মূত্র সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দিতেন। Heatley এবং Chain সেই মূত্র পুনরায় পাতন করে অবিক্রীত পেনিসিলিনটুকু উদ্ধার করতেন, যাতে পরদিন আবার আলবার্টকে তা দেওয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসায় এটি অকল্পনীয় মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময় বিজ্ঞানের প্রতিটি কণা ছিল রক্তের চেয়েও দামি। আলবার্টের মৃত্যু হয়েছিল কেবল ওষুধের অভাবে। কিন্তু বিশ্ববাসী জেনে গেল—ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে মানুষের হাতে এখন এক অজেয় অস্ত্র আছে, এই ওষুধ কার্যকর। এই ঘটনাই Florey-কে বাধ্য করেছিল মহাদেশ পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় যেতে, কারণ ব্রিটেন তখন নাৎসি বাহিনীর বোমায় বিধ্বস্ত।
পেনিসিলিন যখন সাফল্যের শিখরে, তখন শুরু হলো এর মালিকানা বা ‘পেটেন্ট’ নিয়ে বিতর্ক। ফ্লেমিং এবং ফ্লোরি উভয়েই ছিলেন আদর্শবাদী। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, “মানুষের জীবন বাঁচানোর ওষুধ দিয়ে ব্যবসা করা অপরাধ”। তাঁরা কোনো পেটেন্ট নিতে অস্বীকার করেন। কিন্তু আমেরিকার কোম্পানিগুলো একে পেটেন্ট করতে চাইল। এই নিয়ে ব্রিটেন ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ঠান্ডা লড়াই চলেছে। শেষ পর্যন্ত মানবতার জয় হয়েছিল। ফ্লেমিংয়ের সেই অগোছালো ল্যাবরেটরির অবহেলা আর অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীদের নিঃস্বার্থ লড়াইয়ের ফলেই আজ আমরা ওষুধের দোকানে গিয়ে সস্তায় অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারি। এই অধ্যায়টি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, বড় কোনো আবিষ্কার কেবল একজন মানুষের হাত ধরে আসে না; এর পেছনে থাকে হাজারো মানুষের শ্রম।
পেনিসিলিনের কার্যপ্রণালী বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত চমকপ্রদ। ব্যাক্টেরিয়ার কোষের চারপাশে একটি শক্ত কোষপ্রাচীর থাকে, যা পেপ্টিডোগ্লাইক্যান দিয়ে গঠিত। এই প্রাচীর ব্যাক্টেরিয়াকে সুরক্ষা দেয় এবং অভ্যন্তরীণ চাপ সহ্য করতে সাহায্য করে।
পেনিসিলিন ‘ট্রান্সপেপ্টিডেস’ নামক এনজাইমকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে নতুন কোষপ্রাচীর তৈরি হতে পারে না। ব্যাক্টেরিয়া ভেতরের চাপে ফুলে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত ফেটে যায়—এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় লাইসিস।
মানুষের কোষে কোষপ্রাচীর নেই। ফলে পেনিসিলিন নির্দিষ্টভাবে কেবল ব্যাক্টেরিয়াকে আক্রমণ করে। এই নির্বাচনী ক্ষমতাই একে ইতিহাসের প্রথম সফল অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিন্তু বিজ্ঞান চিরস্থায়ী জয় দেয় না। অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারের ফলে কিছু ব্যাক্টেরিয়া পেনিসিলিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। তারা ‘পেনিসিলিনেজ’ এনজাইম তৈরি করে ওষুধকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
ফ্লেমিং তাঁর নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছিলেন—অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে ভয়ংকর সমস্যা দেখা দেবে। আজকের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সেই সতর্কবার্তার বাস্তব প্রতিফলন। অতএব, এই আবিষ্কারের প্রতি সম্মান দেখানো মানে দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পেনিসিলিনের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রে বৃহৎ শিল্পকারখানায় ফার্মেন্টেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন শুরু হয়। ভুট্টা-ভিত্তিক ‘Corn Steep Liquor’ ব্যবহারে উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৪ সালের ডি-ডে অভিযানে মিত্রবাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত পেনিসিলিন ছিল। ফলাফল ছিল ঐতিহাসিক—যুদ্ধক্ষেত্রে সংক্রমণে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
১৯৪৫ সালে ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও চেইন যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এটি ছিল কেবল তিনজন ব্যক্তির স্বীকৃতি নয়; এটি ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক অধ্যবসায়ের জয়।
পেনিসিলিনের গল্প কেবল একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাহিনি নয়; এটি পর্যবেক্ষণ, কৌতূহল, অধ্যবসায় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গল্প। একটি অগোছালো পেট্রি ডিশে জন্ম নেওয়া ছত্রাক আজ লাখো প্রাণ বাঁচিয়েছে। ফ্লেমিংয়ের সেই ‘ভুল’ আসলে ছিল প্রস্তুত মনের হাতে ধরা পড়া এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
বিজ্ঞান কখনও হঠাৎ অলৌকিক কিছু দেয় না — অলৌকিক হলো মানুষের অদম্য প্রশ্ন করার ক্ষমতা। আর সেই প্রশ্নই একদিন মৃত্যুর অন্ধকার যুগ থেকে মানবসভ্যতাকে এনে দিয়েছে জীবনের আলোয়।
পেনিসিলিন তাই শুধু একটি ওষুধ নয়—
এটি মানবতার ইতিহাসে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
