Home LITERATURE তারুণ্যের জয়গান: কলকাতা বইমেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল ‘গপ্পোবাগীশ’প্রকাশনী

তারুণ্যের জয়গান: কলকাতা বইমেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল ‘গপ্পোবাগীশ’প্রকাশনী

0

সদ্য সমাপ্ত ৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকল। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড আয়োজিত এই মহামিলন মেলায় ছোট-বড় সহস্রাধিক স্টলের ভিড়েও নিজের জাত চিনিয়েছে উদীয়মান প্রকাশনী সংস্থা ‘গপ্পোবাগীশ’। অদম্য জেদ, তারুণ্যের শক্তি এবং বাংলা সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগকে সম্বল করে এই নবীন প্রকাশনী এবারের বইমেলায় এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মেলার ৯ নম্বর গেট ও লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের নিকটবর্তী ৬০২ নম্বর স্টলটি ছিল আয়তনে মাত্র ৫০ বর্গফুট। কিন্তু প্রবাদ আছে, বড় কিছু করার জন্য বিশাল জায়গার নয়, বরং বিশাল হৃদয়ের প্রয়োজন হয়। প্রকাশক বৈদূর্য্য পাড়িয়ার নেতৃত্বে গপ্পোবাগীশ সেটাই প্রমাণ করেছে। যাত্রাপথের মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই একক ও যৌথ সংকলন মিলিয়ে আইএসবিএন (ISBN) যুক্ত প্রায় ৫০০টি বই প্রকাশ করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে এই সংস্থা। সদিচ্ছা থাকলে যে ক্ষুদ্র পরিসরেও সৃজনশীলতার মহীরুহ গড়ে তোলা যায়, এই ছোট্ট স্টলটি ছিল তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায়—উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প, ভৌতিক অলৌকিক, রহস্য, কল্পবিজ্ঞান থেকে শুরু করে প্রবন্ধ ও থ্রিলার—গপ্পোবাগীশ তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। পাঠকদের প্রবল আগ্রহে মেলা চলাকালীনই তাদের একাধিক একক বই নিঃশেষিত হয়ে যায়। এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন একদল স্বপ্নদর্শী তরুণ। সম্পাদকমণ্ডলীর শুভজিৎ মণ্ডল, শুভ ঘোষ, দেবাঞ্জন রায়, ড. তিতাস পাল, অঙ্কিতা বণিক, রঙ্গন ঘটক, বৈশালী গুহ রায়, অরুণাভ এবং উদীয়মান কবি সুশান্ত বেরার নিরলস পরিশ্রমে এই উদ্যোগ পূর্ণতা পেয়েছে। তাঁদের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘অক্ষরলিপি’, ‘শব্দতরঙ্গ’, ‘নদীর চুপকথারা’, ‘চিরহরিৎ ল্যান্ডস্কেপ’, ‘উত্তরণ’, ‘স্বপ্নের শহর কলকাতা’, ‘ব্যক্তিগত দিনলিপি’, ‘অন্তর্লীন প্রহর’, ‘পুরোনো শুক্তো’, ‘নিঃশব্দের পদাবলী’ এবং ‘অন্ধকার পেরোলেই মৃত্যু’-র মতো সংকলনগুলি পাঠকমহলে বিশেষ সমাদর পেয়েছে।
নবীনদের এই কর্মযজ্ঞ মুগ্ধ করেছে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরও। মেলা চলাকালীন স্টলে উপস্থিত হয়ে তাঁদের আশীর্বাদ ও উৎসাহ দিয়েছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক সোমজা দাস, বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী, সৈকত মুখোপাধ্যায়, অভীক সরকার, ড. সমুদ্র বসু, ড. অর্ঘ্য দীপ্ত কর, কৌশিক মজুমদার, অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী ও অভীক দত্ত। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন ভিসি কলেজের উপাধ্যক্ষ স্বামী বেদানুরাগানন্দজী, প্রথিতযশা শিল্পী দেবাশীষ মল্লিক চৌধুরী এবং বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো গুণীজনেরা। তাঁদের সান্নিধ্য গপ্পোবাগীশের আগামী দিনের পথচলায় এক নতুন আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
গপ্পোবাগীশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর তারুণ্য। বর্তমান সময়ে যখন তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা দেখা যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে এই দলটি স্রোতের বিপরীতে হেঁটে বাংলা সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরার এক সাহসী নজির গড়েছে। তাঁরা শুধু নিজেদের স্বপ্নই পূরণ করছেন না, বরং বহু প্রতিভাবান নবীন লেখক-লেখিকাকে তাঁদের লেখনী প্রকাশের একটি মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ উপহার দিচ্ছেন। হারিয়ে যেতে বসা অনেক সুপ্ত প্রতিভা এই প্রকাশনীর হাত ধরে নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছে।
সম্প্রতি বাংলা ভাষা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ধ্রুপদী ভাষার (Classical Language) স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের এই সাহিত্যচর্চা বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। গপ্পোবাগীশের মতো নবীন প্রকাশনীগুলোর এই সৃজনশীল মানসিকতা যত প্রসারিত হবে, বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার ততই সমৃদ্ধ হবে—এটাই আজ সাহিত্যপ্রেমীদের প্রত্যাশা।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version