পূর্ব ভারতের উভচর প্রাণী, বিশেষ করে ব্যাঙ নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণায় Orissa Cricket Frog (Fejervarya orissaensis) প্রজাতির বিস্তৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রজাতিটি প্রথম বর্ণনা করেন S. Dutta (১৯৯৭ সালে), যিনি এটিকে প্রথমে Limnonectes orissaensis নামে চিহ্নিত করেন। পরে শ্রেণিবিন্যাসগত সংশোধনের মাধ্যমে এর বর্তমান নামকরণ করা হয়।
ভারতের মধ্যে এই ব্যাঙটি মূলত ওডিশার বিভিন্ন সংরক্ষিত অঞ্চলে যেমন সিমলিপাল বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, ভীতরকনিকা জাতীয় উদ্যান এবং কার্লাপাট অভয়ারণ্যে পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়েও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়। ভারতের বাইরে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডেও এই প্রজাতির বিস্তৃতি রয়েছে, যা এর বিস্তৃত ভৌগোলিক অভিযোজন ক্ষমতা নির্দেশ করে।
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরা মহকুমার আকলাবাদ গ্রাম থেকে এই প্রজাতির প্রথম উপস্থিতির রেকর্ড। ২০১৮ সালের ২৯ জুন রাতে মাঠ পর্যবেক্ষণের সময় একটি অস্থায়ী জলাশয়ের পাশে একটি পুরুষ ব্যাঙের ডাক শোনা যায় এবং পরবর্তীতে আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নমুনাগুলোকে আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয় এবং একটি নমুনা জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায় সংরক্ষিত রাখা হয়।
এই ব্যাঙের বাসস্থান বৈচিত্র্যময়। এটি অস্থায়ী জলাশয়, পুকুর, হ্রদ, ঘাসভূমি, ধানক্ষেত, ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের তীর এবং পাহাড়ি ঝর্ণার কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানব-প্রভাবিত পরিবেশেও এদের দেখা যায়। শীতকালে এরা পাথর, গাছের গুঁড়ি ও পাতা স্তরের নিচে আশ্রয় নেয় এবং বর্ষাকালে এদের প্রজনন ঘটে।
শারীরিক গঠনের দিক থেকে এই প্রজাতিটি মাঝারি আকারের, মাথা তুলনামূলকভাবে লম্বা এবং ত্বক দানাদার প্রকৃতির। দেহের রঙ সাধারণত ধূসর-বাদামি এবং চোখের মাঝখানে V-আকৃতির চিহ্ন দেখা যায়। পায়ে কালো ডোরা থাকে এবং উরুর পাশে হলদে-সাদা রঙের উপর কালো দাগ থাকে। এদের ত্বকের গঠন এবং বিভিন্ন দাগ-ছোপ শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্যাঙাচি বা ট্যাডপোলের গঠনও গবেষণায় বর্ণিত হয়েছে। এদের দেহ ও লেজ ধূসর-বাদামি এবং তাতে গাঢ় দাগ থাকে। এরা মূলত জলাশয়ের তলদেশে বসবাস করে এবং Cyanophyceae, Chlorophyceae, Bacillariophyceae ও Euglenophyceae শ্রেণির শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে। পূর্ণবয়স্ক ব্যাঙ নিশাচর ও স্থলজ এবং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী ভক্ষণ করে। কিছু ক্ষেত্রে এদের শিকার হয় সাধারণ এশীয় টোড (Duttaphrynus melanostictus) দ্বারা।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের কুলটি শিল্পাঞ্চলে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় ব্যাঙের দেহে পরজীবী সংক্রমণ নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে Hoplobatrachus tigerinus এবং Fejervarya limnocharis প্রজাতির ব্যাঙ সংগ্রহ করে তাদের দেহে বিভিন্ন হেলমিন্থ পরজীবীর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় Diplodiscus amphichrus নামক ট্রেমাটোড এবং Seuratascaris numidica নামক নেমাটোড শনাক্ত করা হয়, যা এই অঞ্চলের জন্য নতুন রেকর্ড।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, Seuratascaris numidica প্রজাতিটি প্রথমবারের মতো ভারতে রিপোর্ট করা হয়েছে। এছাড়াও Acuariidae পরিবারের কিছু নেমাটোডের লার্ভা Fejervarya limnocharis প্রজাতির ব্যাঙের দেহগহ্বরে সিস্ট আকারে পাওয়া যায়। এই পরজীবীরা সাধারণত জলচর পাখির দেহে পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় থাকে এবং ব্যাঙ এখানে মধ্যবর্তী বা পরিবাহী পোষক হিসেবে কাজ করে।
গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত অন্তত নয় প্রজাতির হেলমিন্থ পরজীবী ব্যাঙের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ট্রেমাটোড ও নেমাটোড উভয়ই রয়েছে। এই গবেষণাগুলো উভচর প্রাণীর জীববৈচিত্র্য, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশগত ভূমিকা এবং রোগ সংক্রমণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও গভীর গবেষণা পরিচালনা করলে এই অঞ্চলের উভচর প্রাণী ও তাদের পরজীবী বৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
