শনিবার কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। মৌলালি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য যুব কেন্দ্র অডিটোরিয়ামে ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রতিভা সন্ধান’-এর ২৫ বছর পূর্তি বা রজত জয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত ‘বিশ্ব সাহিত্য সম্মেলন ২০২৫’ কার্যত এক আন্তর্জাতিক নক্ষত্র সমাবেশে পরিণত হয়েছিল। ভারতসহ বিশ্বের ১৪টি দেশের প্রায় ৫০০-র বেশি প্রথিতযশা কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষক এদিন এক ছাদের তলায় সমবেত হয়ে বাংলা সাহিত্যের জয়গান গাইলেন।
বর্ণাঢ্য উদ্বোধন ও পদযাত্রা
সকাল ৯টায় শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ১০০-র বেশি সাহিত্যিকের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য পদযাত্রার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। এরপর জাতীয় পতাকা এবং পত্রিকার পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল শ্যামল কুমার সেন এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিক শ্রী পৃথ্বীরাজ সেন প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন শ্রীমন্ত কুমার মন্ডল।

সাতটি পর্বে গুণীজনদের মেলা
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে বিভক্ত ছিল, যেখানে সভাপতিত্ব করেন নিজ নিজ ক্ষেত্রের দিকপালরা:
- প্রথম পর্ব: সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মিরাতুন নাহার।
- দ্বিতীয় পর্ব: সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সাহিত্যিক ভোলানাথ হালদার।
- তৃতীয় পর্ব: সভাপতিত্ব করেন শ্রী মানিক পন্ডিত।
- চতুর্থ পর্ব: সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি ও ‘বাঙালি বিশ্বকোষ’-এর প্রধান সম্পাদক শেখ আব্দুল করিম।
- পঞ্চম পর্ব: সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক সমুদ্র বিশ্বাস।
- ষষ্ঠ পর্ব: সভাপতিত্ব করেন টিপু সুলতান।
- সপ্তম পর্ব: সভাপতিত্ব করেন সিরাজুল ইসলাম ঢালী।
পুরো অনুষ্ঠানের মূল সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ডক্টর শঙ্কর প্রসাদ নস্কর এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাহারুল হামিদ।

- আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট : সম্মেলনে বিদেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ওমান থেকে ড. সুধীর রঞ্জন দে ও ড. সুবীর দে, মালয়েশিয়া থেকে ড. সন্তোষ কুমার চক্রবর্তী, আমেরিকা থেকে চিন্ত্য চৌধুরী ও ড. চিন্ময় চৌধুরী, নেপাল থেকে কেশরী অমগাইন ও মাধব প্রসাদ ঘিমিরে এবং শ্রীলঙ্কা থেকে শ্রী নির্মল দেব। এছাড়াও দিল্লি, রাজস্থান, মেঘালয়, অসম, ত্রিপুরা ও কর্ণাটক থেকে আসা জাতীয় স্তরের সাহিত্যিকরা আলোচনায় অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সমীর চন্দ্র দাস এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ঘোষ।
- আব্দুল করিম ও অন্যান্যদের বক্তব্য
চতুর্থ পর্বের সভাপতি, প্রখ্যাত কবি ও শিশু সাহিত্যিক শেখ আব্দুল করিম তাঁর বক্তব্যে সাহিত্যের সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতার মেলবন্ধন ঘটান। তিনি বলেন:
“সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ। আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘শত কণ্ঠে সংবিধান পাঠ’ কর্মসূচীকে পূর্ণ সমর্থন জানাই। বর্তমান সময়ে প্রতিটি নাগরিকের কাছে সংবিধানের চেতনা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সুস্থ সমাজ গড়তে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।”

অন্যান্য পর্বের সভাপতিগণ
মানিক পন্ডিত, সমুদ্র বিশ্বাস, টিপু সুলতান এবং সিরাজুল ইসলাম ঢালী—আধুনিক সাহিত্যের বিবর্তন, গবেষণার গুরুত্ব এবং নতুন প্রজন্মের লেখকদের সম্ভাবনা নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা পেশ করেন।
- আড়াই দশকের গৌরবময় পথচলা ২০০০ সালের ১৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগণার মন্দির বাজারের বিজয়গঞ্জ বাজার থেকে যে ক্ষুদ্র যাত্রার শুরু হয়েছিল, আজ তা ২৫ বছরে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে জানান, বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
- এদিনের সম্মেলনে বিশেষ অবদানের জন্য গুণীজনদের ‘বিশ্ব সাহিত্যরত্ন’ ও ‘বিশ্ব প্রতিভারত্ন’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। রাত্রি ৮টা পর্যন্ত চলা এই মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যিক আদান-প্রদান আগামী দিনে বাংলা সাহিত্যের সেবায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহলে।



