অপেক্ষার মানে
জেরিন জাহান দিশা
“মানুষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু মানুষ কি আর মানুষের জন্য অপেক্ষা করে?”
খলিসাকুন্ডি বড় বাজারের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে একটা চায়ের দোকান। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ,আর চারপাশে ধুলো মাখা কাঁচা রাস্তা-সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত গ্রামীণ নীরবতা। দোকানের ভেতর থেকে কেতলির শব্দ আর দুধ -চায়ের ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
দোকানের মালিক হাশেম মিয়া। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। সংসার বলতে তার কেউ নেই। স্ত্রী মারা গেছেন বহু বছর আগে,আর সন্তান হওয়ার সৌভাগ্যও হয়নি কখনো। তবু তার বুকটা একেবারে শূন্য ছিল না -কারণ সেখানে জায়গা করে নিয়েছিল একটা অনাথ ছেলে,রাকিব।
রাকিবেরও পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ ছিল না। ছোটবেলায় বাবা -মা দুজনকেই হারিয়েছিল সে। গ্রামের মানুষ দয়া করত,কেউ খাবার দিত,কেউ পুরানো কাপড়। কিন্তু হাশেম মিয়া শুধু দয়া করেননি। তিনি ছেলেটাকে নিজের নাতির মতো আগলে রেখেছিলেন।
চায়ের দোকানের ফাঁকে ফাঁকে তিনি রাকিবকে পড়াতেন। পুরানো বই জোগাড় করতেন, রাতে দোকান বন্ধ করে কুপির আলোয় বসিয়ে অক্ষর চিনাতেন।কখনো নিজে না খেয়ে ছেলেটার স্কুলের ফি দিয়েছেন। এক রাতে দোকান বন্ধের পর হাশেম মিয়া বললেন,
-“শোন রাকিব, মানুষ গরিব হলে জীবন থেমে যায়।”
রাকিব মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।সেই চোখে তখন শহর দেখার স্বপ্ন,বড় মানুষ হওয়ার ইচ্ছে। দিনের পর দিন কেটে যায়। রাকিব বড় হয়। বিকেলে স্কুল শেষে দোকানের সেই কাঠের বেঞ্চে বসে চা খেতে খেতে পড়াশোনা করত। হাশেম মিয়া দূর থেকে তাকিয়ে থাকতেন, যেন নিজের অপূর্ণ জীবনটাকে ছেলেটার স্বপ্ন পূর্ণ হতে দেখছেন।
একদিন বিকেলের স্নান আলোয় রাকিব বলল,-“চাচা আমি শহরে যাব।একটা চাকরির চেষ্টা করব। ভালো কিছু করতে পারলে আপনাকে আর কষ্ট করতে দেব না।”হাশেম মিয়ার চোখে সেদিন অদ্ভুত আলো ফুটে উঠেছিল। তিনি মৃদু হেসে বললেন,-“আমি কষ্টে নেই বাবা তুই মানুষ হ,এটাই আমার সুখ। শুধু একটা কথা মনে রাখিস -যেখানে যাস, নিজের মানুষদের ভুলে যাস না।”
রাকিব মাথা নাড়ল । সেদিন সন্ধ্যার বাতাসেও যেন একরাশ স্বপ্ন উড়ছিল।শহরে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম কিছুদিন রাকিব নিয়মিত ফোন করত।-“চাচা চাকরির চেষ্টা করছি।”-“চাচা ,আজ একটা ডেলিভারি বয়ের কাজ পেয়েছি। পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। সামনে আমার এস.এস.সি পরীক্ষা তুমি আমার জন্য দোয়া করও। হাশেম মিয়া বলল,তোর জন্য সবসময় দোয়া করি তুই যেন সুখে থাকিস।
দেখতে দেখতে দুটো বছর পেরিয়ে গেল। কিন্তু রাকিব আর হাশেম মিয়ার খোঁজ নেই না। হাশেম মিয়াকে দোকানের অনেক খদ্দের জিজ্ঞেস করে। তোমার নাতি কেমন আছে? তোমার কথা তো ভুলেই গেছে? পার হয়ে গেলে কেউ আর মনে রাখে না। হাশেম মিয়া হেসে উত্তর দিল।ও সুখে আছে এটাই আমার শান্তি।
রাত তখন প্রায় দশটা। হাশেম মিয়া দোকানটা বন্ধ করবে সেই ঠিক সময় একটা কালো গাড়ি এসে থামল। হাশেম মিয়া গাড়িটার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। গাড়ির ভিতর থেকে একজন নামছে ।পায়ে কালো জুতা। চোখে চশমা।মুখে একগাল দাঁড়ি। হাশেম মিয়া এক পা দু পা করে এগিয়ে গেল গাড়ির কাছে।
হঠাৎ করে একজন হাশেম মিয়ার পায়ে সালাম করল। হাশেম মিয়া যেন স্বপ্ন দেখছেন। হঠাৎই তার সেই পরিচিত কণ্ঠে বললেন, কেমন আছো চাচা?আমি রাকিব।আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি।আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি। জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।”হাশেম মিয়া মৃদু হেসে বললেন,-“জীবন কাউকে দূরে নিয়ে যায় না বাবা। মানুষ নিজের আপন মানুষদের থেকে দূরে সরে যায়।”
রাকিব আর নিজেকে সামলাতে পারল না।তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।সে বুঝতে পারল -সে শহর থেকে টাকা,গাড়ি, সম্মান সব এনেছে; কিন্তু যে মানুষটা তাকে বাবা-মায়ের অভাব ভুলিয়ে মানুষ বানিয়েছিল,তার অপেক্ষার মূল্য সে দিতে পারেনি। হাশেম মিয়া নরম গলায় বললেন,-“তুই যখন ছোট ছিলি, আমি তোকে নিজের নাতির মতো মানুষ করেছি।
কারণ আমার কেউ ছিল না।আর তোরও কেউ ছিল না। ভাবছিলাম, বুড়ো বয়সে তুই এসে একদিন বলবি-“চাচা, আমি ফিরে এসেছি।সেই কথাটার অপেক্ষায় ছিলাম।”রাকিব হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। হাশেম মিয়া তার কাঁধে হাত রেখে শেষবারের মতো বললেন,-“টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায়, কিন্তু কারো অপেক্ষা কেনা যায় না।”
রাকিব সেই বেঞ্চের ওপর বসে পড়ল।তার পরিচিত সেই জায়গাটা চোখ মেলে দেখল। দেখতে পেল সবকিছু আগের মতোই আছে।সে দেখতে পেল নিজের হারিয়ে ফেলা বছরগুলো একটা মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অপেক্ষা।আর হাশেম মিয়ার চোখে তখন শান্তি।
কারণ যার জন্য তিনি এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন,সে অবশেষে ফিরে এসেছে।
শিক্ষা: জীবনে সফলতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মানুষদের মনে রাখা।যে মানুষ নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে,তার অপেক্ষার মূল্য পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে শোধ করা যায় না।
–
