শহর কলকাতা। যানবাহনের কোলাহলের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যগুলো কলকাতার প্রাচীন গৌরব বহন করে চলেছে আজও। গঙ্গা নদীর পাড়ে শহর ঘেঁষা একটা গ্রাম শিবপুর। গ্রামটা ছোটো হলেও বেশ আভিজাত্যপূর্ণ। সুবিমল সান্যাল শিবপুর উত্তমাসুন্দরী হাইস্কুলের অঙ্কের শিক্ষক। ছেলে অনিকেত সান্যাল সীমান্তের সৈনিক। অবশ্য সুবিমলবাবু চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসা, তাঁকে যেনো আকর্ষন করতো সবসময়। অনিকেত বাবুর স্ত্রী রূপসা ও মেয়ে বৃষ্টি। বৃষ্টি যেনো তাঁর হৃৎপিণ্ড। থাকতেই পারতেন না এক মূহুর্ত তাকে ছাড়া। মেয়ের দুই বছর বয়সের থেকে ফ্যামিলি নিয়ে থাকতেন সিমলাতে। তখন অনিকেত বাবুর সিমলায় পোস্টিং ছিল। কিন্তু প্রায়শই বাইরে যেতে হতো বলে মেয়ের পড়াশুনোর ক্ষতি হতো। তাই পাকাপাকিভাবে মা – মেয়েকে বাড়িতেই রেখে আসেন তিনি। সেসময় বৃষ্টি দশম শ্রেণীতে ভর্তি হয় শিবপুর হাইস্কুলে। এতবছর পর বাবাকে ছেড়ে থাকায় বৃষ্টির খুব মন খারাপ হয়, সেইসঙ্গে তার বাবারও। কিন্তু কিছু করার নেই। সংসার আর দেশ দুজনকেই সমানভাবে ভালবাসেন তিনি। তাই কি বা করার থাকে। একমাত্র ভরসা চিঠি। তখন মুঠোফোনের চল ছিল না তেমন। তাই প্রতি সপ্তাহে উনি বৃষ্টিকে একটি করে চিঠি উপহার দিতেন, বৃষ্টিও প্রত্যুত্তর পাঠাতো। তখন কাশ্মীরে জঙ্গিদের প্রতিহত করার জন্য কারগিল সেক্টর থেকে প্রায় একশো কিমি দূরে এক দুর্গম জনবসতিহীন এলাকায় ক্যাম্প ফেলতে হয়েছে অনিকেতবাবুর দলের সৈনিকদের। এবারে বৃষ্টিকে দেওয়া চিঠিতে তিনি লিখেছেন-
“স্নেহের বৃষ্টি,
আমরা জিতবোই। প্রগাঢ় দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওই জঙ্গিদের আমরা দূর করব। তুমিও আত্মপ্রত্যয়ী হও, মাকে সাহস দিও, তোমরা ভালো থেকো। এবার বাড়ি ফেরার সময় তোমার জন্য টিফিন কৌটোতে করে এক টুকরো মেঘ নিয়ে যাব। আমি ভালো আছি – জয় হিন্দ!
—— তোমার বাবা ”
প্রায়ই তিনি এ ধরনের চিঠি লিখতেন। এই চিঠিগুলো বৃষ্টির কাছে অমূল্য সম্পদ। এক এক করে বাক্সভর্তি চিঠি।
কিন্তু বৃষ্টি তখন বুঝতে পারেনি ওটাই তার বাবার শেষ চিঠি। সেদিন আর্মি সেক্টর থেকে চরম দুঃসংবাদের টেলিগ্রামটা এল – জঙ্গিদের গুলিতে শহীদ হন অনিকেত বাবু। এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে বৃষ্টির মা সেরিব্রাল সক্ পেয়ে বৃষ্টিকে ছেড়ে চলে গেল কয়েক মাসের মধ্যেই। হঠাৎ করে যেনো তার জীবনে বয়ে গেল কালবৈশাখী ঝড়। কিন্তু বৃষ্টি অতটা দমে যায়নি। তার বাবার বীরের মতো মৃত্যু কল্পনা করে বৃষ্টি যেন নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হল, নতুনভাবে সে অনেক সাহায্য পেল, আর্মি স্কুলে পড়তে পেল বিনা পয়সায়। একদিন বৃষ্টি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলো ও সেইসাথে সি.বি.এস.ই. এন্ট্রান্স দিয়ে মেডিকেলে ভালো ফল করল। ওর এইসব জয়ের পেছনে রয়েছে বাবার দেওয়া চিঠিগুলি যেগুলো বৃষ্টির আনন্দের নিত্যসঙ্গী।
এরপর সেইসঙ্গে শুভদিন। শোনা গেল জঙ্গিদের নেতা ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে, বাকি জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করেছে। ঐদিন ওর বাবার কথা খুব মনে পড়ছিল। এখন ওর চোখে শুধু আনন্দাশ্রু। সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টি তার বাবাকে চিঠি লিখতে বসলো, যদিও সে জানেনা মৃত্যুর পর তার বাবা এখন কোথায়! জঙ্গিদের ধরা পড়ার খবর নিয়ে সে এক দীর্ঘ চিঠি। তখন আকাশে সাদা সাদা মেঘ যেন শান্তির বার্তা নিয়ে অজানা ঠিকানার উদ্দেশ্যে ভেসে চলেছে। কয়েকটা গ্যাস বেলুন নিয়ে জাতীয় পতাকাসহ সেই চিঠি সে বেলুনের সাথে বেঁধে দিল। বেলুনগুলো উঠছে ওপরের দিকে, ওপরে – আরো ওপরে – দেখতে লাগলো সে।
“মেঘের দেশের চিঠি” তার বাবার কাছে বার্তা নিয়ে যাচ্ছে – এটাই বৃষ্টির ধারণা। আর মনে হতে লাগল তার বাবা যে এক টুকরো মেঘ আনবে বলেছিলেন, সেই মেঘই যেন তার চোখে বৃষ্টিতে পরিণত হয়ে ঝরে পড়ছে।
