“অন্ধকারের হিসাব”

0

আসানসোল শহরের একপ্রান্তে, পুরোনো কয়লাখনির ধারে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা এক প্রাসাদ—লোকমুখে যার নাম দত্ত বাড়ি। দিনের আলোয় সেটি নিঃশব্দ, কিন্তু রাত নামলেই যেন দেয়ালগুলো শ্বাস নেয়, আর অন্ধকারের ভিতর থেকে কেউ ফিসফিস করে।

প্রদীপ দে—একজন হিসাবরক্ষক, সংখ্যার মানুষ—অলৌকিক ব্যাপারকে কখনোই গুরুত্ব দেননি। তাঁর কাজ স্পষ্ট, যুক্তি পরিষ্কার। কিন্তু সেই যুক্তিই ভেঙে পড়তে শুরু করল, যেদিন তিনি দত্ত বাড়ির পুরোনো হিসাবের খাতা হাতে পেলেন।

খাতাটি এসেছিল এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে—“কর্ণিকা ইন্টারন্যাশনাল”-এর নতুন প্রজেক্টের জমি কিনতে গিয়ে পাওয়া যায় বাড়িটি। জমির দলিল ঠিক করতে গিয়ে উঠে আসে এই পুরোনো হিসাব। প্রদীপের কাজ ছিল শুধু সংখ্যাগুলো যাচাই করা।

কিন্তু প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখা—

“হিসাব মেলেনি। কেউ বাকি আছে।”

প্রদীপ ভেবেছিলেন, হয়তো পুরোনো কোনো ব্যবসায়িক বাকির কথা। কিন্তু যতই তিনি পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন, ততই সংখ্যা গুলো অদ্ভুত হয়ে উঠল—

প্রতিটি এন্ট্রির শেষে একটি নাম, আর একটি তারিখ… আর সেই তারিখের পরেই লেখা—“অদৃশ্য।”

সেই রাতেই প্রদীপ প্রথম স্বপ্নটা দেখলেন।

তিনি দাঁড়িয়ে আছেন দত্ত বাড়ির ভেতরে। চারপাশ অন্ধকার, শুধু একটি কেরোসিন ল্যাম্প জ্বলছে। টেবিলের ওপরে সেই হিসাবের খাতা। হঠাৎ পেছন থেকে কণ্ঠস্বর—

“আমার হিসাবটা মেলাও…”

প্রদীপ ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন—একজন মানুষ, মুখটা ঝাপসা, কিন্তু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।

পরদিন সকালেই তিনি ঠিক করলেন, একবার জায়গাটা ঘুরে দেখে আসবেন।

দত্ত বাড়িতে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগল। ঘরের ভেতরে সবকিছু ধুলোয় ঢাকা, কিন্তু মাঝখানের টেবিলটা অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার। যেন কেউ নিয়মিত সেখানে বসে।

প্রদীপ খাতাটা বের করে টেবিলে রাখলেন। হঠাৎই বাতাস থেমে গেল। আর তারপর—

খাতার পৃষ্ঠাগুলো নিজে নিজেই উল্টাতে শুরু করল।

শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে থামল।

সেখানে লেখা—

“শেষ হিসাব—প্রদীপ দে”

প্রদীপের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

“এটা কীভাবে সম্ভব?”—তিনি ফিসফিস করলেন।

ঠিক তখনই পেছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

ধপ!

ঘরের ভেতর অন্ধকার নেমে এল।

একটা কণ্ঠস্বর—এবার অনেকগুলো—

“তুমি হিসাব মিলাও… না হলে তুমি-ও বাকি থাকবে…”

প্রদীপ কাঁপতে কাঁপতে খাতার দিকে তাকালেন।

সব নামের পাশে একটাই সংখ্যা—“০”

কিন্তু তাঁর নামের পাশে—

“১”

মানে—একটা অসম্পূর্ণ হিসাব।

হঠাৎ তাঁর মাথায় এল—এই সব লোকেরা কি কোনোদিন এখানে কাজ করত? হয়তো তাদের পাওনা মেটেনি! হয়তো তারা বাকি টাকার জন্যই আটকে আছে!

প্রদীপ তাড়াতাড়ি ফোন বের করলেন, কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই।

ঘরের ভেতর ঠান্ডা আরও বাড়ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তিনি খাতার পাশে থাকা পুরোনো ফাইলগুলো খুঁজতে লাগলেন। সেখানে কিছু নথি পেলেন—

বহু বছর আগে, এই বাড়িতে একটি কয়লাখনি কোম্পানি চলত। শ্রমিকদের বেতন আটকে রেখে মালিক হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। আর তারপর থেকেই একে একে সবাই অদৃশ্য হতে থাকে…

প্রদীপ বুঝলেন—এই হিসাব টাকা দিয়ে মেটানো যাবে না।

তিনি খাতার শেষ পাতায় কলম দিয়ে লিখলেন—

“সব পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হলো। সবাই মুক্ত।”

এক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর—

একসাথে অনেকগুলো নিঃশ্বাসের শব্দ… যেন কেউ ভারমুক্ত হলো।

দরজাটা আস্তে খুলে গেল।

প্রদীপ বাইরে বেরিয়ে এলেন। সূর্যের আলো চোখে পড়তেই মনে হলো যেন তিনি কোনো দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছেন।

কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়।

সেই রাতে, বাড়ি ফিরে তিনি নিজের অফিসের ল্যাপটপ খুললেন।

নতুন একটি মেইল এসেছে।

Subject: Pending Balance

Attachment: একটি এক্সেল ফাইল।

প্রদীপ ফাইলটা খুললেন।

একটি মাত্র সারি—
Name: Pradip Dey

Status: Still Due

আর নিচে লেখা—

“সব হিসাব কাগজে মেটানো যায় না… কিছু হিসাব আত্মা নেয়।”

হঠাৎ তাঁর ঘরের লাইটটা টিমটিম করে উঠল।

পেছন থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—

“তোমার হিসাব… এখনো বাকি…”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here