শেষ সাক্ষী
জেরিন জাহান দিশা
“যদি আমি বলি-এই খুনের আসল খুনি আমি তাহলে তুমি কি আমার গল্পটা শুনতে চাইবে?”
রাত তখন ১২টা।থানার ভেতরটা অস্বাভাবিক শান্ত
টেবিলের ওপর খোলা একটা ফাইল -নাম:শাকিবুল ইসলাম।একটা লকড রুম মার্ডার।দরজা ভেতর থেকে লক।জানালা বন্ধ।কেউ ঢোকেনি,কেউ বের হয়নি। তবুও -একজন মানুষ মারা গেছে।
তুমি হলে কী বলতে? আত্মহত্যা?
ডিটেকটিভ সাইমুমও প্রথমে সেটাই ভেবেছিল। কিন্তু একটা জিনিস তাকে থামিয়ে দিল-কফির কাপ।কাপে বিষের চিহ্ন। কিন্তু কাপটা রাখা বাম পাশে -যেখানে একজন ডানহাতি মানুষ সাধারণত কাপ রাখে না।তাহলে?কেউ কাপটা সরিয়েছে?প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ-সুবর্ণা , মৃতের স্ত্রী।”আপনি কিছু শুনতে পাননি?”না আমি ঘুমাচ্ছিলাম।”
সবকিছু স্বাভাবিক তবুও কিছু যেন ঠিক নেই।কারণ, পাশের ঘরে একজন মানুষ মারা যাচ্ছে আর তার স্ত্রী কিছুই টের পায়নি? তারপর এলো হাবিবুর -ম্যানেজার ।”আপনার কি কোনো শত্রুতা ছিল?” “না স্যার আমি তাকে মারব কেন?” কথা ঠিক কিন্তু চোখে লুকানো ভয়।কারণ -কয়েকদিন আগেই সে চাকরি হারানোর নোটিশ পেয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রশ্ন –
যদি কেউ ঢোকেনি তাহলে খুনটা হলো কীভাবে? সিসিটিভি চেক করা হলো।রাত ১০টার পর কেউ ঢোকেনি। শুধু শাকিবুল ইসলাম নিজেই ঘরে ঢুকেছে। তারপর নীরবতা-সাইমুম আবার সূবর্ণার সামনে দাঁড়াল।”আপনি দরজা ভেঙেছিলেন,তাই তো?” “জি”
“কিন্তু আপনি কীভাবে বুঝলেন -উনি মারা গেছেন?”সুবর্ণা থমকে গেল। কারণ -যে জানে কেউ মারা গেছে,সে-ই আগে দরজা ভাঙতে।সাইমুম ধীরে বলল,”আপনি কফিতে বিষ মিলিয়েছিলেন। তারপর বাইরে থেকে দরজা লক করেন। সকালে নাটক করেন -কান্না, ভাঙা দরজা”সুবর্ণার চোখে ভয়।
সবাই বুঝে গেল-খুনি কে। কিন্তু সাইমুম চুপ হয়ে গেল।ঘর নিস্তব্ধ।”এই বিষটা খুব বিরল।এটা সাধারণ কারও কাছে থাকে না”সাইমুম ধীরে বলল,”হ্যাঁ তুমি চেনো না।” “কারণ বিষটা দিয়েছি আমি।”কথাটা শোনামাত্র ঘরটা জমে গেল। হাবিবুর ফিসফিস করে বলে-“আপনি?”সাইমুম জানালার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভেসে উঠল অতীত -একজন সৎ মানুষ।ছোট একটা ব্যবসা।একটা স্বপ্ন -ছেলেকে বড় মানুষ বানানোর।সে মানুষটা-তার বাবা।শাকিবুল ইসলাম তার পার্টনার তারপর-জাল কাগজ, মিথ্যা অভিযোগ, বিশ্বাসঘাতকতা একদিন সেই সৎ মানুষটাই হয়ে গেল”প্রতারক।”সমাজ তাকে অপমান করল। বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিল।
আর এক রাতে সে নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দিল। সাইমুম তখন ছোট।তাকে বদলে দিয়েছিল।সে বড় হলো ডিটেকটিভ হলো।আর একদিন -তার সামনে এলো সেই মানুষ -শাকিবুল ইসলাম।আইন শাস্তি দিতে পারত। কিন্তু সাইমুম চেয়েছিলেন সে যেন ধীরে ধীরে শেষ হয়।তাই সে বিষ জোগাড় করল।
সুবর্ণার ভুল -শুধু তার কাজটা সহজ করে দিল। ঘরের ভেতর কেউ কথা বলছে না। সাইমুম ফাইলটা বন্ধ করল।লিখল “Case Closed”. বাইরের ভোরের আলো উঠছে। সবকিছু শান্ত। কিন্তু তুমি বলো-এটা কি সত্যিই এখনও বেঁচে আছে অন্য কোনো ছায়ার মধ্যে।
