*স্বাধীনতার পরিহাস*
–জুবায়ের আহসান
সবার আগে স্বাধীনতার মশাল
জ্বালিয়েছিলেন মুসলমান,
নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও মহিশূরের টিপু সুলতান,
স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে করতে
করেন শাহাদাত বরণ।
ইংরেজ হায়েনাদের নাপাক অভিপ্রায়
বুঝতে পারেন সর্বপ্রথম উলামায়ে কেরাম,
প্রকৃতপক্ষে আঠারোশো তিন সাল থেকে হয় প্রচলন,
উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী আজাদী আন্দোলন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে সমরকুশলী
বীর সিপাহশালার সাইয়েদ আহমদ শহীদের নেতৃত্বে,
তা প্রত্যক্ষ রূপ করে ধারণ।
আঠারোশো একত্রিশ সালে সংঘটিত
হয়েছিল বালাকোটের মর্মান্তিক যুদ্ধ,
উপমহাদেশের বুকে পরিচালিত সর্বপ্রথম রণডঙ্কা
যা ছিল সুসংঘবদ্ধ।
বিখ্যাত আলেমে দ্বীন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভীর চিন্তা
ও দর্শনের আলোকে,
পরিচালিত হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন।
বিশ্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস শাহ আব্দুল আযীযের
ফতোয়ার কারণ,
শুরু হয়েছিল উপমহাদেশ থেকে
ইংরেজ বিতাড়ন,
হিন্দুস্তানে শুরু হয়েছিল
স্বাধীনতার মহা-জাগরণ।
স্বাধীকার সংগ্রামের বীর সেনানী,
শিখ বংশোদ্ভূত মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি
দেওবন্দের রূহানী সন্তান,
আজাদী সংগ্রামের জন্য সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর
স্বেচ্ছায় করেন নির্বাসিত জীবনযাপন।
ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে দুই লাখের বেশি
শহীদ হন মুসলমান,
শুধু আঠারোশো সাতান্ন সালে ফাঁসিতে ঝুলেছিল
সাতাশ হাজার মুসলমান।
সিপাহী বিদ্রোহের সংগ্রামে শহীদ আহমেদ উল্লাহ শাহ
করেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন,
তিনি ছিলেন বিদ্রোহের আলোক বর্তিকা ও
ঐক্যের প্রতীক হিন্দু-মুসলমান,
তাঁকে হত্যা করেছিল ব্রিটিশ এজেন্ট
পাওয়ানের রাজা জগন্নাথ সিং।
দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে খোদিত আছে
বিরানব্বই হাজার তিনশত তেষট্টি জন শহীদের নাম,
তন্মধ্যে একষট্টি হাজার নয়শত পয়তাল্লিশ জন
শুধুমাত্র মুসলমান।
আঠারোশো চৌষট্টি থেকে সাতষট্টি-এই তিন বছরে
ফাঁসিতে ঝুলেছিল চোদ্দো হাজার মুসলমান,
দিল্লির চাঁদনি চক থেকে লাহোর সড়ক পর্যন্ত,
প্রতিটি গাছে আলেমদের লাশ ছিল ঝুলন্ত,
ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে
চলে তাদের ওপর নির্যাতন।
শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে
আমৃত্যু বন্দি করে পাঠানো হয় রেঙ্গুন,
দুই পুত্রের ছিন্ন মস্তক ট্রেতে করে
তাঁর সামনে করা হয় উপস্থিত।
পুত্রদ্বয়ের মাথা হাতে নিয়ে বলেন,
তৈমুরের পুত্ররাও তোমাদের ন্যায়,
বিজয়ী বেশে পিতার সামনে,
এভাবে হয়েছিল উপস্থিত।
ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা ফযলে হক খায়রাবাদী,
সিপাহী বিদ্রোহের প্রাক্কালে দিয়েছিলেন ফতোয়া
ইংরেজ বিরোধী।
এ কারণে আন্দামান দ্বীপে হয়েছিল তাঁর নির্বাসন,
কঠোর বন্দি জীবনে ভোগ করেছিলেন অসহ নির্যাতন।
কয়লা দ্বারা কাফনের কাপড়ে লিখেছিলেন আত্মজীবন,
‘আসসাওয়ারাতুল হিন্দিয়া’ পুস্তকে ফুঁটিয়ে তুলেছিলেন
তাঁর বেদনার অনুরণন।
স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সিপাহশালার,
হুসাইন আহমদ মাদানী আদালতে বলেন,
নিজের রুমাল জজকে দেখিয়ে
এটা আমার কাফন।
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার প্রথম সাংবাদিক হিসাবে
যাকে ফাঁসি দিয়েছিলেন–মীর বাকির তাঁর নাম।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মালাবারের মুসলমান,
মোপলা বাহিনীদের ছিল অসামান্য অবদান।
ঊনিশশো একুশ সনে মালাবারকে
ঘোষণা করেছিলেন স্বাধীন,
স্বাধীনতার পতাকা তাঁরা করেছিলেন উড্ডীন।
ইতিহাস খ্যাত ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের
যিনি ছিলেন মূল কারিগর,
তিনি হলেন ফকির মজনু শাহ ,
ঊনবিংশ ও বিংশ শতক জুড়ে
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে,
করেছিলেন সুগভীর প্রেরণা সঞ্চার।
প্রথম গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল
ফকির সন্ন্যাসীরাই করেছিলেন অবলম্বন,
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান
পরবর্তীতে করেন প্রচলন,
রেশমী রুমাল আন্দোলন।
আমরা পেয়েছি সৈয়দ নিসার আলী
ওরফে শহীদ তীতুমীর,
বাঁশের কেল্লা খ্যাত স্বাধীন চেতা মহান বীর।
আমরা পেয়েছি একটি নাম শহীদ গোলাম মাসুম,
হয়েছিল ফাঁসি ইতিহাসে তাঁর প্রথম। বড়লাটকে মারতে গিয়ে ক্ষুদিরামের হয়েছিল ফাঁসি,
তাঁর নামে গাওয়া হয়, ‘একবার বিদায় দে মা
ঘুরে আসি’।
আমরা পেয়েছি বিপ্লবী শের আলী খান, যার হৃদয়ে জেগেছিল স্বাধীনতার বান।
বড়লাটকে হত্যা করে,করেন জান কুরবান,
অথচ তাঁর সম্মানে গাওয়া হয়নি একটিও গান।
আমরা পেয়েছি শহীদ আশফাক উল্লাহ
যিনি ছিলেন দেশের অকুতোভয় নির্ভিক সন্তান,
ফাঁসীর মঞ্চে উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর মুখে
পবিত্র আল-কুরআন।
সুভাষচন্দ্র বোস ইতিহাস খ্যাত মহান নেতাজী,
তাঁর খ্যাতির পশ্চাতে ছিলেন
মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি।
বিদেশ যাত্রায় নেতাজী করেছিলেন ছদ্মবেশ ধারণ,
নাম পরিবর্তন করে হয়েছিলেন মৌলবী জিয়াউদ্দীন।
তাঁর তৈরী আযাদ হিন্দ ফৌজের স্তবগান ‛সাব সুখ চেইন কি বারসা বারসে’
লিখেছিলেন মুমতাজ হুসেন।
‛জয় হিন্দ’ স্লোগানটির প্রথম
সক্রিয় উদ্ভাবক
আযাদ হিন্দ ফৌজের মেজর
আবিদ হাসান সাফরানি,
‛ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানের স্রষ্টা
সর্বপ্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেওয়া কবি,
মাওলানা সৈয়দ ফজল-উল-হাসান
ওরফে হাসরাত মোহানী।
ঊনিশশো সাতচল্লিশ সালে
লাল কেল্লা থেকে যিনি প্রথম,
ব্রিটিশদের পতাকা উপড়ে ফেলে
ভারতের পতাকা করেছিলেন উড্ডীন,
আযাদ হিন্দ ফৌজের কমান্ডার
ক্যাপ্টেন শাহ নাওয়াজ খান।
ইউসুফ মেহের আলী যিনি প্রথম
দিয়েছিলেন স্লোগান,
‛কুয়াইট ইন্ডিয়া’ তথা ‛ভারত ছাড়ো’ ও
‛গো ব্যাক সাইমন’।
‛সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’
নামক জাতীয় সংগীত,
লিখেছিলেন মহাকবি আল্লামা ইকবাল,
যিনি ছিলেন ব্রাম্ভণ বংশোদ্ভূত
কাশ্মীরি পন্ডিত।
ব্রিটিশ বিরোধী মুক্তি সংগ্রামে
কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা
শ্রদ্ধার সঙ্গে করি স্মরণ,
কবি হিসাবে স্বাধীনতার জন্য প্রথম
তিনিই ধরেছিলেন কলম।
‛সারফারোশি কি তামান্না আব
হামারে দিল মে হে’
লিখেছিলেন বিসমিল আজিমাবাদী।
তবুও শুনতে হয় মুসলমানদেরকে
নানান অপবাদ,
যথা-আই এস আই-এর চর
সন্ত্রাসবাদী,
পেয়েছে এরা খেতাব
স্বাধীনতা ও দেশ বিরোধী।
স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের
নেই কোন অবদান,
পদে পদে প্রশ্নচিহ্নের মুখে
পড়ে মুসলমান,
দেখাতে হয় নাগরিকত্বের
যথাযথ প্রমাণ।
ইতিহাসের পাতায় সেভাবে উচ্চারিত হয়নি
তাঁদের নাম,
একপেষে বা মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে
তাঁদের প্রতি করা হয়েছে অসম্মান।
হিন্দু-মুসলিম শিখ ঈসায়ী
আর যত আছে স্বাধীনতা সংগ্রামী,
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও বিভাজন না করে
করতে হবে তাঁদের প্রতি মর্যাদা প্রদান।
ইতিহাসে দিতে হবে সকলকে যথাযথ স্থান,
তবেই হবে তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জ্ঞাপন।
*****************************
নিমদীঘি,উলুবেড়িয়া,হাওড়া-৭১১৩১৬,
পশ্চিমবঙ্গ,ভারত।মোবাইল-৯০৩৮৬৭০৬৬৪
