Home OPINION বাংলা চলচ্চিত্রের মহাসঙ্কট: সোনায় মোড়ানো অতীত থেকে কেন এই পতন?

বাংলা চলচ্চিত্রের মহাসঙ্কট: সোনায় মোড়ানো অতীত থেকে কেন এই পতন?

0

নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের হাত ধরে যে বাংলা সিনেমা একসময় বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ছিনিয়ে এনেছিল, আজ সেই বঙ্গদেশেই বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। হলগুলোতে দর্শক নেই, বড় বাজেটের ছবি তৈরির সাহস পাচ্ছে না প্রযোজকরা, আর ডাবিং করা দক্ষিণী বা বলিউড ছবির দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে স্থানীয় সিনেমা। কিন্তু প্রশ্ন হলো— শৈল্পিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই বঙ্গে কেন এই অবনতি?
১. মৌলিক গল্পের আকাল ও নকলের প্রবণতা
বাংলা সিনেমার পতনের প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় ‘মৌলিকতার অভাব’। একটা দীর্ঘ সময় ধরে টলিউড মূলত দক্ষিণী ছবির (তামিল/তেলেগু) ফ্রেম-টু-ফ্রেম কপি করার পথে হেঁটেছে। ইন্টারনেটের যুগে দর্শক যখন এক ক্লিকেই আসল সিনেমাটি দেখে নিচ্ছেন, তখন তাঁরা কেন হলে গিয়ে সেই একই গল্পের বাংলা ভার্সন দেখবেন? এই ‘রিমেক’ সংস্কৃতি সাধারণ দর্শকের মন থেকে বাংলা সিনেমার প্রতি সম্মান কমিয়ে দিয়েছে।
২. অতিরিক্ত গোয়েন্দা নির্ভরতা
বর্তমানে টলিউডের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গোয়েন্দা চরিত্র (ফেলুদা, ব্যোমকেশ, সোনাদা) ছাড়া যেন সিনেমা হওয়াই অসম্ভব। সৃজনশীলতার এই একঘেয়েমি দর্শকদের ক্লান্ত করে তুলছে। সামাজিক জীবনের জটিলতা বা নতুন কোনো মানবিক আখ্যানের বদলে পরিচালকরা স্রেফ পুরনো নস্টালজিয়া ভাঙিয়ে ব্যবসা করতে চাইছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের ক্ষতি করছে।
৩. বাজেট ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
বলিউড বা দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় টলিউডের বাজেট অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে দর্শক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে (OTT) বিশ্বমানের ভিজ্যুয়াল এফেক্ট দেখতে অভ্যস্ত। সেই তুলনায় বাংলা ছবির টেকনিক্যাল মান বা ভিএফএক্স (VFX) অনেক ক্ষেত্রে সেকেলে থেকে গেছে। ফলে বড় পর্দার যে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ অভিজ্ঞতা দর্শক চান, তা টলিউড দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৪. হল সংখ্যা হ্রাস ও প্রদর্শনের সমস্যা
পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গল স্ক্রিন বা ছোট সিনেমা হলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাল্টিপ্লেক্সে টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম মধ্যবিত্ত দর্শকের নাগালের বাইরে। তার ওপর অভিযোগ ওঠে, প্রাইম টাইমে বড় হিন্দি ছবির চাপে বাংলা ছবি শো পায় না। ফলে ভালো সিনেমা তৈরি হলেও তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
৫. রাজনীতিকরণ ও স্বজনপোষণ
ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে রাজনীতি এবং নির্দিষ্ট কিছু ‘লবি’-র প্রভাব মেধাবী নতুনদের উঠে আসতে বাধা দিচ্ছে বলে মনে করেন অনেক সমালোচক। প্রতিভার চেয়ে সংযোগ বা যোগাযোগ বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় কাজের মান কমছে। এছাড়া ওটিটি আসার পর অনেক নামী পরিচালক বড় পর্দার চেয়ে ছোট পর্দার বিষয়বস্তুতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
মুক্তির উপায় কী?
বাংলা সিনেমাকে আবার স্বমহিমায় ফেরাতে গেলে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি:
* মৌলিক চিত্রনাট্য: সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সমসাময়িক মৌলিক গল্পে জোর দিতে হবে।
* পরীক্ষামূলক সিনেমা: গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তার সিনেমা করতে হবে।
* বিপণন ও প্রচার: আধুনিক উপায়ে সিনেমার প্রচার বাড়াতে হবে যাতে তরুণ প্রজন্ম হলমুখী হয়।
* সরকারি ভর্তুকি: ছোট বাজেটের শৈল্পিক ছবিগুলোকে সরকারিভাবে আরও বেশি উৎসাহ ও স্ক্রিন দেওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার:
বাঙালির সংস্কৃতি মনস্কতা আজও অটুট, কিন্তু দর্শক এখন অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা কেবল নস্টালজিয়া দিয়ে নয়, বরং আধুনিক রুচিসম্মত এবং বুদ্ধিনির্ভর সিনেমা দেখতে চান। টলিউড যদি এই পরিবর্তনকে আপন করতে না পারে, তবে বাংলা সিনেমার এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়া কঠিন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Exit mobile version