পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর সংকটের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। শিল্পীরা, যাঁদের বলা হয় সমাজের বিবেক, আজ তাঁরাই কি কোণঠাসা? ভারতীয় সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিলেও, বাংলার মাটিতে সেই অধিকার আজ প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে সংগীত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ ও হেনস্তার ঘটনা নতুন এক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে কেন শিল্পীদের বাকস্বাধীনতা (Freedom of speech for artists) আজ চরম সংকটে? কেন সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও শিল্পীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন? বিস্তারিত বিশ্লেষণে উঠে এল ৭টি চাঞ্চল্যকর কারণ।
১. বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সুরক্ষা
ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজের মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সামাজিক বা রাজনৈতিক অসঙ্গতি তুলে ধরা শিল্পীদের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হোক বা জনসভা—ভিন্ন মত পোষণ করলেই শিল্পীদের কপালে জুটছে ‘ট্রোলিং’ কিংবা সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি। এটি শুধুমাত্র শিল্পের ওপর আঘাত নয়, বরং সরাসরি সংবিধানের ওপর আঘাত।
২. পশ্চিমবঙ্গে সংগীত শিল্পীদের ওপর আক্রমণের ইতিহাস
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে প্রতিবাদের গান বা গণসংগীতের এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ঐতিহ্যে কালিমালিপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের সমালোচনা করলেই সংগীত শিল্পীদের লাইভ অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেওয়ার ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এই ধরণের ‘অলিখিত সেন্সরশিপ’ তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে, যা সুস্থ সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
৩. কেন এই অসহিষ্ণুতা? (৭টি চাঞ্চল্যকর দিক)
সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ। প্রধান ৭টি কারণ হলো:
- রাজনৈতিক মেরুকরণ: শিল্পীদের নিরপেক্ষ থাকার বদলে কোনো একটি ‘পক্ষে’ থাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
- সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং: সাইবার বুলিং এখন ভিন্ন মত দমন করার প্রধান হাতিয়ার।
- আয়োজকদের ওপর চাপ: রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে শিল্পীদের পারফরম্যান্স বাতিল করতে বাধ্য করা।
- নিরাপত্তার অভাব: প্রকাশ্য মঞ্চে হেনস্তার শিকার হলেও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না পাওয়া।
- ভয়ের সংস্কৃতি: একবার টার্গেট হলে ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি।
- আর্থিক প্রতিবন্ধকতা: প্রতিবাদী শিল্পীদের সরকারি অনুদান বা বড় প্রজেক্ট থেকে বাদ রাখা।
- শিল্পের রাজনীতিকরণ: শিল্পের গুণমানের চেয়ে শিল্পীর রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
৪. আইনি সুরক্ষা ও বাস্তব প্রয়োগ
সংবিধান অধিকার দিলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুলিশি নিরাপত্তা বা আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে শিল্পীদের দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হয়। যদিও দেশের উচ্চ আদালত বারবার জানিয়েছে যে, সৃজনশীল কাজের ওপর পেশিশক্তির ব্যবহার গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে দুর্বল করে দেয়। বর্তমানে অনেক শিল্পী একজোট হয়ে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলছেন, যা ইতিবাচক একটি দিক।
৫. উপসংহার
শিল্পীরা হলেন সমাজের আয়না। সেই আয়না যদি ভেঙে ফেলা হয়, তবে সমাজ নিজের কদর্য রূপ আর দেখতে পাবে না। পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী রাজ্যে শিল্পীদের বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সংবিধান আমাদের যে সুরক্ষাকবচ দিয়েছে, তা যেন কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে হার না মানে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। জয় যেন সবসময় সত্য আর শিল্পেরই হয়।



