গ্রামের এক প্রান্তে, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি পুরোনো স্কুল ভবন দাঁড়িয়ে আছে—ভাঙা জানালা, শ্যাওলা ধরা দেয়াল, আর উঠোন জুড়ে বুনো আগাছা। জায়গাটার নামই হয়ে গেছে
—“কঙ্কালের স্কুল”। সন্ধ্যার পর কেউ সেখানে যায় না। শোনা যায়, সেখানে নাকি আজও ক্লাস চলে… তবে ছাত্ররা আর মানুষ নেই।
অভিরূপ, শহর থেকে সদ্য গ্রামে বেড়াতে এসেছে। সে এসব ভূতের গল্পে বিশ্বাস করে না। একদিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সে বলেই ফেলল, “ভূত বলে কিছু নেই! আজ রাতেই আমি ওই স্কুলে গিয়ে প্রমাণ করে দেব।”
বন্ধুরা অনেক বুঝিয়েও তাকে আটকাতে পারল না। রাত বারোটার দিকে, হাতে টর্চ আর মোবাইল নিয়ে অভিরূপ ঢুকে পড়ল সেই স্কুলে।
ভেতরে ঢুকতেই তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চারপাশে এক অদ্ভুত ঠান্ডা, যেন বাতাসও নিঃশ্বাস নিতে ভয় পাচ্ছে। ভাঙা বেঞ্চগুলো এখনও সারি করে রাখা, ব্ল্যাকবোর্ডে অস্পষ্টভাবে লেখা
—“আজকের পাঠ: নীরবতা।”
হঠাৎ করিডোরের শেষ থেকে ভেসে এলো মৃদু শব্দ—“টক… টক… টক…”
মনে হলো, কেউ যেন কাঠের বেঞ্চে আঙুল ঠুকছে।
অভিরূপ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। একটি ক্লাসরুমের দরজা আধখোলা। সে ভেতরে উঁকি দিতেই বুকের রক্ত জমে গেল—বেঞ্চে বসে আছে কয়েকটি কঙ্কাল, সাদা হাড়ের কাঠামো, মাথা নিচু করে
যেন খাতায় কিছু লিখছে!
একটি কঙ্কাল ধীরে মাথা তুলল। তার ফাঁকা চোখের গর্ত যেন অভিরূপের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর একসাথে সব কঙ্কাল মাথা তুলল।
ঘরের মধ্যে ভেসে এলো কর্কশ স্বর—
“নতুন ছাত্র এসেছে…”
অভিরূপ পিছু হটতে গিয়েও পারল না। দরজাটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। ব্ল্যাকবোর্ডে নিজে নিজেই চক দিয়ে লেখা শুরু হলো—
“ভর্তি পরীক্ষা শুরু।”
হঠাৎ এক কঙ্কাল উঠে এসে তার হাতে একটি খাতা ধরিয়ে দিল। পাতায় লেখা—
“প্রশ্ন ১: মৃত্যুর পর কেমন লাগে?”
অভিরূপ কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি… আমি বাঁচতে চাই…”
ঘরের ভেতর হঠাৎ অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়ল।
“এখানে সবাই একসময় এটাই বলেছিল…”
হঠাৎ আলো নিভে গেল। চারদিক অন্ধকার। কেবল হাড়ের ঠকঠক শব্দ, আর ধীরে ধীরে কাছে আসা ঠান্ডা স্পর্শ…
পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা স্কুলের সামনে অভিরূপের মোবাইলটা পড়ে থাকতে দেখল।
কিন্তু অভিরূপ আর কোথাও নেই।
কয়েকদিন পর, গ্রামের এক ছেলে কৌতূহলবশত স্কুলের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে—
একটি নতুন কঙ্কাল বেঞ্চে বসে আছে…
তার সামনে খোলা খাতা, আর ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা—
“নতুন ছাত্র: অভিরূপ”
তারপর থেকে, গ্রামের লোকেরা বলে—
ওই স্কুলে এখনও ক্লাস চলে…
আর মাঝে মাঝে, রাতের গভীরে শোনা যায়—
“স্যার, আমি বাঁচতে চাই…”
