শান্তিনিকেতনের গীতবিতান অডিটোরিয়ামে গত ৫ই এপ্রিল, রবিবার এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো জেনারেশন অ্যাচিভার আয়োজিত ‘বসন্ত বরণে রবীন্দ্র স্মরণ’। সর্বভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য দিশারী ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মহামঞ্চের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রয়াত সুপ্রিয় ঠাকুরের পুত্র তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশ প্রজন্ম সুদৃপ্ত ঠাকুর। সমগ্র অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি, প্রবীণ সাংবাদিক ও লালন গবেষক বরুণ চক্রবর্তী। প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সভাপতি প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায় আকস্মিক অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত থাকলেও উপস্থিত সুধীজনের সশ্রদ্ধ উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গরিমা অক্ষুণ্ণ রাখে। সহ-সভাপতির আসন অলংকৃত করেন প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কান্ডারী ডঃ দীপ্তি মুখার্জী।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথিবর্গের তালিকায় ছিলেন বিশিষ্টজনের নক্ষত্র সমাবেশ। উপস্থিত ছিলেন বোলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক গবেষক ডঃ স্বরূপ মালাকার, ডঃ সর্বজিৎ যশ, জাতীয় শিক্ষক ডঃ সাধন কুমার হালদার, জনাব আব্দুস সালাম, ডঃ সোমালি চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক ধনঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক ডঃ কৃষ্ণেন্দু দে। এছাড়াও উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের শোভাবর্ধন করেন চিত্রপরিচালক বিশ্বরূপ সিনহা, অভিনেতা অজয় ভট্টাচার্য্য, ঔপন্যাসিক সিরাজুল ইসলাম ঢালী ও কুন্তল গুহ, অধ্যাপক গবেষক গুরু প্রসাদ দাস, বোলপুর আদালতের বিচারক বাণী ব্রত দত্ত, অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনার প্রতীক মুখার্জী এবং কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী শোভন বন্দ্যোপাধ্যায়। দুর্নীতি দমন শাখার প্রাবন্ধিক প্রলয় বসু, বাউল শ্রী সত্যরঞ্জন মণ্ডল এবং কবি চিরন্তন দাসের উপস্থিতিও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ভিত্তিক সম্ভবত প্রথম যৌথ সাহিত্য সংকলন ‘অন্তর্লীন‘-এর আনুষ্ঠানিক উন্মোচন।




গুণীজন ও কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে এই বিশেষ গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়, যার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট কবি উত্তম প্রামাণিক ও দিশা ভৌমিক। সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকা বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী সুপ্রিয়া ঘোষ ও শিক্ষক কবি ছদ্মনামে পরিচিত ‘সুখ কবি’ তাঁদের সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
সাংস্কৃতিক পর্বে স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনা এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। বসন্তের রঙে রঙিন আবীর ও বাসন্তী বসনে শিল্পীদের উপস্থিতি সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয় দর্শকদের মাঝে। আন্তর্জাতিক সাহিত্য দিশারীর প্রাণপুরুষ শিক্ষক কবি হিমেন্দু দাসের নেতৃত্বে এই পর্বে অংশগ্রহণ করেন সঙ্গীতা বসু রায়, উজ্জ্বল কুমার পতি, সুমিতা পয়ড়্যা, পম্পা হালদার, গোপা দেবনাথ, মানসী দে চ্যাটার্জী, মেঘ ছায়া সরকার, পাপড়ি দত্ত, তনুশ্রী রায়, মিতা মিত্র স্যানাল, অশ্রু কণা দাস, সনত দেবনাথ, শুভ্র ব্যানার্জী, আশালতা মাইতি, সৌমেন কর ও বরুন সমাদ্দার।

বিচিত্রধর্মী এই আয়োজনে একে একে পারফর্ম করে দর্শকমন জয় করেন কানন হাঁসদা, জ্যোৎস্নাময় ঘোষ, আছারুদ্দিন শেখ, রূপকথা সমাদ্দার, সৌম্য কর, সায়ন্তনী পাল, রায়া ভট্টাচার্য্য এবং সঙ্গীত শিল্পী ঝিমলি চক্রবর্তী ও প্রণতি সাহা। প্রাক্তন সেনা আধিকারিক অনিল চন্দ্র সিকদার, প্রাবন্ধিক রঞ্জনা গুহ ভট্টাচার্য, শিশু শিল্পী ঋতান্না দাস সহ প্রায় ১৬০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী এই মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির সফল রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সাংবাদিক সৌরভ দত্ত, সুসংগঠক সৌমেন সেন এবং সুব্রত চ্যাটার্জী।
যৌথ সংকলন উন্মোচনের মুহূর্তে মঞ্চে ৬৫ জন কবি ও সাহিত্যিকের উপস্থিতি এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানের শেষে সমবেত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। জেনারেশন অ্যাচিভারের চেয়ারপারসন জানান, আগামী দিনেও আর্তের সেবায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি বাংলার সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। সব মিলিয়ে শান্তিনিকেতনের পবিত্র প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই বসন্ত উৎসব সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মহলে এক দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেল।



