বাঙালির প্রাণের উৎসব কলকাতা বইমেলা কি এবার তঞ্চকতার চারণভূমি হয়ে উঠছে? বইয়ের ঘ্রাণ আর বৌদ্ধিক চর্চার আবহে এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি সিলমোহর ও জাতীয় প্রতীকের অপব্যবহার করে বিলি করা হচ্ছে রহস্যময় কিছু শংসাপত্র, যা নিয়ে শহরজুড়ে বইছে বিতর্কের ঝড়।
গোলমালের সূত্রপাত কোথায়?
সম্প্রতি মেলা প্রাঙ্গণে বেশ কিছু লেখক, শিক্ষক ও বিশিষ্টজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, গোল বেঁধেছে শংসাপত্রের নকশা নিয়ে। সেখানে দাপটের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ এবং আন্তর্জাতিক মানক সংস্থা ISO-র নাম। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদন বা গেজেট বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কীভাবে একটি বেসরকারি সংস্থা এই প্রতীক ব্যবহার করছে, তা নিয়েই উঠছে বড়সড় প্রশ্ন।
দায় এড়ানোর খেলায় ‘ট্রুথ ওয়াল’
এই বিভ্রান্তিকর সম্মাননা বিতরণের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে “ট্রুথ ওয়াল” নামক একটি সংস্থা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সত্যতা যাচাই করতে সংস্থার কর্ণধার সৈকত চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। প্রাথমিক আলাপচারিতায় তিনি শংসাপত্র বিতরণের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও, প্রশ্নের মুখে তাঁর সুর পাল্টাতে শুরু করে।
একপর্যায়ে তিনি দায় ঝেড়ে ফেলে দাবি করেন:
“যাঁরা শংসাপত্র পেয়েছেন, তাঁরাই নাকি এগুলি নিজেরা ছাপিয়ে নিয়েছেন!”
একজন আয়োজক হিসেবে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য নতুন করে সন্দেহের দানা বাঁধছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি প্রাপকরাই শংসাপত্র ছাপিয়ে থাকেন, তবে সেই অনুষ্ঠানে সংস্থার নাম ও লোগো ব্যবহৃত হলো কেন? আর কেনই বা আয়োজক হিসেবে তিনি সেই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন?
আইনি জটিলতা ও অশনি সংকেত
ভারতীয় আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া জাতীয় প্রতীকের ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রতীক আইন (State Emblem of India Act, 2005): এই আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থে অশোক স্তম্ভের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
পেশাগত ঝুঁকি: এই বিতর্কিত শংসাপত্র গ্রহণকারীরাও কিন্তু বিপদমুক্ত নন। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীরা যদি এই ধরনের ‘ভুয়ো’ স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত হন, তবে তাঁদের ক্যারিয়ারে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
বইমেলার মতো পবিত্র একটি মঞ্চে যখন এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, তখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। প্রকৃত মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যাঁরা সম্মান পান, তাঁদের অর্জনের গুরুত্ব এই ‘রেডিমেড’ সম্মানের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি যেমন মেধার অবমাননা, ঠিক তেমনই আইনি পরিসরে এক গভীর অপরাধমূলক প্রবণতা।
উপসংহার
সম্মান কেনা যায় না, তা অর্জন করতে হয়। কিন্তু বইমেলার আলোয় আধাঁরের এই খেলা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। আজ শংসাপত্র নিয়ে জালিয়াতি হচ্ছে, কাল হয়তো আরও বড় কোনো প্রতারণা সামনে আসবে। বইমেলা কি তবে কেবল বাণিজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বিভ্রান্তির আঁতুড়ঘর হয়ে উঠবে? নাকি প্রশাসন নড়েচড়ে বসে এই ‘সম্মাননা বাণিজ্যের’ শিকড় উপড়ে ফেলবে— এখন সেটাই দেখার।
বইমেলার আড়ালে ‘সম্মাননা’র ফাঁদ? অশোক স্তম্ভ ও ISO চিহ্নের অপব্যবহারে ঘনীভূত রহস্য
Date:



