বর্তমান সময়ের জ্বলন্ত সামাজিক সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়— এই সবকিছুর ভিড়ে কি হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা? নাকি নতুন করে ‘কলম’ ধরার সময় এসেছে? এই কঠিন প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখেই ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার’ চ্যানেলে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশেষ লাইভ আলোচনা: “কলম ধরবে না?”।
এই মননশীল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন প্রগতিশীল তরুণ লেখক ও ছাত্র— দেবরাজ সাহা, সাম্যব্রত ভৌমিক এবং উদয় বর্মন। দীর্ঘ আলোচনায় উঠে এল শিক্ষা, রাজনীতি, প্রযুক্তি এবং নারী নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক।
১. শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
আলোচনার শুরুতেই উদয় বর্মন বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটি তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেমিস্টার সিস্টেমের প্রবল চাপ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অভাব আজ যুবসমাজকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং যোগ্য প্রার্থীদের ওপর পুলিশের আক্রমণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন আলোচকরা। তাঁদের মতে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে।
২. বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা কি অপরাধ?
সাহিত্য কি কেবলই বিনোদন? দেবরাজ সাহা আক্ষেপের সুরে বলেন, “আজ অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিগত স্বার্থে বা ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না।” তাঁর এই কথার রেশ ধরে সাম্যব্রত ভৌমিক মনে করিয়ে দেন যে, অন্যায় দেখে নীরব থাকাও এক প্রকার অপরাধ। এই অবক্ষয়ের যুগে প্রতিবাদী হয়ে সৎ সাহসের সঙ্গে কলম ধরাই এখন সময়ের দাবি।
৩. প্রযুক্তির মায়া ও সৃজনশীলতার ‘এলিয়েনেশন’
প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার ও অনলাইন গেমিং আসক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মার্ক্সীয় তত্ত্ব (Alienation) উল্লেখ করে উদয় ও সাম্যব্রত জানান, বর্তমান পুঁজিপতিদের মুনাফামুখী ব্যবস্থা মানুষকে তাঁর নিজস্ব সৃজনশীলতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের ধৈর্য ও সহ্যশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে।
৪. ‘অভয়া’ কাণ্ড ও নারী নিরাপত্তা
সমাজে নারী নির্যাতনের ন্যক্কারজনক ঘটনা নিয়ে ধিক্কার জানান আলোচকরা। দেবরাজ সাহা স্পষ্ট জানান, ‘অভয়া’ কাণ্ডের মতো ঘটনা আমাদের সমাজের ব্যর্থতা। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ত্যাগ করে পোশাক বা সময়ের দোহাই না দিয়ে নারীদের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. বেকারত্ব বনাম সংরক্ষণ: এক গঠনমূলক বিতর্ক
বেকারত্ব নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণ প্রথা নিয়ে তৈরি হয় এক চমৎকার তর্কালাপ। দেবরাজ সাহার মতে, মেধার অবমূল্যায়ন করে সংরক্ষণ ব্যবস্থা শিক্ষার মান কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে সাম্যব্রত ভৌমিকের যুক্তি— পিছিয়ে পড়া ও দলিত মানুষকে মূল স্রোতে আনতে সংরক্ষণের যৌক্তিকতা আজও ফুরিয়ে যায়নি।
৬. সম্প্রীতির বার্তা: বিবেকানন্দ ও বিদ্যাসাগরের আদর্শ
ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতি রুখতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শকে হাতিয়ার করার আহ্বান জানানো হয়। ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর মাধ্যমেই এক সুস্থ সমাজ গঠন সম্ভব বলে মনে করেন এই তিন তরুণ তুর্কি।
উপসংহার: “কলম ধরবে না?” অনুষ্ঠানের মূল বার্তা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার— বর্তমান সমাজের অন্যায় ও দুর্নীতির কাছে মাথা নত না করে মেরুদণ্ড সোজা রাখা। ভয় কাটিয়ে সত্য প্রকাশের জন্য তরুণ প্রজন্মকে একজোট হতে হবে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী— কলম যখন গর্জে ওঠে, তখন বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।



