নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উদযাপিত হলো এক অনন্য সাহিত্য সন্ধ্যা। নতুন বছরের (১৪৩২) আগমনী শুভেচ্ছা এবং ২৩শে এপ্রিল ‘বিশ্ব কবিতা ও পুস্তক দিবস’ উপলক্ষে “ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার”-এর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল একটি বিশেষ অনলাইন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে জয় করে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে নবীন-প্রবীণ কবি ও সাহিত্যিকদের এক মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন সুব্রত এবং নেপথ্যে কারিগরি সহায়তায় ছিলেন সৌমেন। তাঁদের সুনিপুণ পরিচালনায় ভার্চুয়াল এই মঞ্চটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
কবিতা ও আবহে সমাজ চেতনার প্রতিফলন
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল আমন্ত্রিত কবিদের স্বরচিত পাঠ ও আবৃত্তি। সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে চিরায়ত প্রেম ও প্রকৃতি—সবই উঠে এসেছে তাঁদের কণ্ঠে:
- সাগরিকা মন্ডল: বর্তমান সমাজের অবক্ষয় ও ভালোবাসার সংকট নিয়ে তিনি তাঁর স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। এছাড়া খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে তাঁর কবিতা “শুধু এক মুঠো” এবং রোমান্টিক ঘরানার “আমি এক সাধারণ মেয়ে” দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
- জয়শ্রী ম্যাম: নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হয়ে তিনি তাঁর প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞতার ঝুলি উন্মোচন করেন। তিনি তাঁর স্বরচিত কবিতা “মাটির কাছাকাছি” এবং “যদি আরো কিছু কথা থাকে বলে ফেল” আবৃত্তির পাশাপাশি কবিগুরুর বিখ্যাত “বৈশাখ” কবিতাটি পাঠ করেন। নতুন প্রজন্মের কবিদের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করার জন্য তিনি অনুপ্রেরণা দেন।
- শশাঙ্ক শেখর চট্টোপাধ্যায়: তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের সুর। বর্তমান সময়ের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং যোগ্য প্রার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি পাঠ করেন “কলমচির প্রতি” এবং “দুর্নীতির বাস্তুতন্ত্র”। তাঁর বলিষ্ঠ শব্দশৈলী অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য বাড়িয়ে দেয়।
- দীপা দত্ত পাল: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ইন্টারনেট বিভ্রাট কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে যুক্ত হয়ে তিনি নজর কাড়েন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের “পশ্চিম” এবং কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় শিশুতোষ কবিতা “খুকি ও কাঠবিড়ালি” আবৃত্তি করে তিনি আসর মাতিয়ে রাখেন।
দুর্ভাগ্যবশত, ইন্টারনেট সমস্যার কারণে কল্যাণী সহ বেশ কয়েকজন কবি তাঁদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যা আয়োজক ও দর্শক উভয়কেই ব্যথিত করেছে।
সাহিত্যিকদের জন্য বড় ঘোষণা: নতুন ওয়েবসাইট ও সংকলন
অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে লেখক ও কবিদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক ঘোষণা করা হয়:
- উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম: সাহিত্যিকদের জন্য একটি নতুন ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যেখানে লেখকরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাঁদের সৃষ্টি প্রকাশ করতে পারবেন। আয়োজকরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার পাঠক এই সাইটটি পরিদর্শন করেন।
- বই প্রকাশের সুযোগ: যে সকল লেখক এই প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন লেখা উপহার দেবেন, তাঁদের একক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে “ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার”।
- ঐতিহাসিক সংকলন: বর্তমান সময়ের জ্বলন্ত ইস্যু ও শিক্ষক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে “শিক্ষার কণ্ঠস্বর” নামে একটি বিশেষ ISBN যুক্ত সংকলন প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়। এছাড়াও “অন্মেষা” ও “সৃজনস্বর” নামে আরও দুটি সংকলন শীঘ্রই প্রকাশিত হতে চলেছে।
প্রতিকূলতা ছাপিয়ে সাফল্যের ছোঁয়া
কালবৈশাখীর তান্ডব ও দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে অনুষ্ঠান চলাকালীন বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও উপস্থিত সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠানটি সার্থক হয়। যান্ত্রিক গোলযোগ ছাপিয়ে সাহিত্যের জয়গানই ছিল এই সন্ধ্যার মূল প্রতিপাদ্য। “ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার”-এর এই উদ্যোগ বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।



